
ছবি: উইমেনআই২৪ ডটকম
ভবন নির্মাণে এফএআর বাড়ানো পরিবেশকে হুমকিতে ফেলবে আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবির কাছে সরকার রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর সাম্প্রতিক উদ্যোগ ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতা ও সামগ্রিক পরিবেশকে আরও হুমকিতে ফেলবে। পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মতামত ও দাবিকে উপেক্ষা করেই সরকার এই সংশোধনের পথে হাঁটছে। এর ফলে জনবহুল ঢাকা শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়বে এবং ইতিমধ্যে স্থবির হয়ে যাওয়া শহরে পরিবহন, পরিসেবা-সহ সব ধরনের নাগরিক সেবার উপর অসহনীয় চাপ পড়বে। এই চাপ বহন করবার ক্ষমতা এই শহরের নেই। এই ধরনের উদ্যোগ কেন্দ্রীয় ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতাকেও একেবারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। আবাসিক এলাকার ভবনসমূহের ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ভবনের উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে হবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অগ্নিদুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। এছাড়া ছয়তলার উপরের ভবনকে বহুতল ভবন বিবেচনায় নিয়ে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধনী এনে ভবনে অগ্নি নিরাপত্তামূলক প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের অনৈতিক প্রভাবকে দূর করে পরিকল্পনাবিদদের স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ না দিলে শহরকে বাসযোগ্য করা এবং পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বুধবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১১টায় বিআইপি’র কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত “ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগঃ বিআইপি’র পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্টজনেরা এই মন্তব্য করেন।
বিআইপির সহ সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিনের সঞ্চালনায় ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ সংক্রান্ত বিআইপির পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনাসমূহ তুলে ধরেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি'র বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ এবং পরিকল্পনাবিদ মো. ফাহিম আবেদীন। পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালে গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই নগরায়ণের জন্য এলাকাভিত্তিক এফএআর মান নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ী ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের চাপের কারণে বারবার ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যা ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
তিনি আরো বলেন, ড্যাপ এর সাম্প্রতিক প্রস্তাবনায় অধিকাংশ এলাকায় এফএআর ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অনুমতি মিলবে, যা যানজট, জলাবদ্ধতা, আলো-বাতাস সংকট ও ইউটিলিটি সেবায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। খিলক্ষেত, বাড্ডা, বাসাবো-খিলগাঁও, রামপুরা ও মিরপুরসহ অনেক এলাকায় এফএআর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, অথচ পরিকল্পনাবিদদের দাবিকে উপেক্ষা করে গুলশান-বনানী ও ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকায় সামান্য কমানো হয়েছে মাত্র। এতে ফার মানের বৈষম্য আবারও জিইয়ে রাখা হয়েছে এবং প্লট মালিকদের অনার্জিত আয় বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে বিআইপি সহ অনেক পরিবেশবাদী সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবী অনুযায়ী কৃষিজমি, জলাভূমি ও বন্যা প্রবাহ এলাকায় উন্নয়ন বন্ধের সুপারিশকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইতিমধ্যেই দুই কোটির বেশি মানুষের চাপের মধ্যে থাকা ঢাকার জন্য এই ধরনের সংশোধনী টেকসই উন্নয়নকে আরও বিপন্ন করবে। ড্যাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুষম জনঘনত্ব ও মানসম্মত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, কিন্তু বর্তমান সংশোধনী সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি আরোও উল্লেখ করেন বিগত ১৮ মার্চ , জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালা পরিবর্তনের প্রভাব ও নাগরিক করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সংবাদ সম্মেলনটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)সহ ১৫টিরও বেশি নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল। তৎপরবর্তীকালে ড্যাপ নিয়ে উপরোক্ত সংগঠনসমূহের লিখিত সুপারিশ ও দাবীদাওয়া গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসকল দাবী দাওয়ার কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি ড্যাপের সংশোধনের উদ্যোগে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের ও হতাশার।
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও জানান, এবারের ড্যাপে রাজউক নতুন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, পার্ক প্রভৃতি নাগরিক সুবিধাদি তৈরীর জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছিল। কিন্তু বিগত তিন বছরে নতুন কোনো খেলার মাঠ হয়নি, এমনকি যেসব খেলার মাঠ বিভিন্ন ক্লাব দখল করে রেখেছে সেগুলো উদ্ধারেও কোন তৎপরতা দেখা যায় নি।
পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ড্যাপ পুনরায় সংশোধনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতাশালীদের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। শহরের উচ্চ জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থার দূর্বলতা মিলিত হয়ে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ঢাকাকেন্দ্রীক উন্নয়নই কেবল গুরুত্ব পাচ্ছে । তিনি আরও বলেন, আবাসিক এলাকার এফএআর বাড়ানো, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বরাদ্দ এবং রাস্তার পরিকল্পনা উপেক্ষা করলে শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। ড্যাপ পুনরায় সংশোধনের ক্ষেত্রে এফএআর নির্ধারণের সময় এসকল বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে, না হলে ঢাকার বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সাংবাদিকের অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও জানান, সারা বাংলাদেশের গ্রামীন ও নগর অঞ্চলগুলোর পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। পরিকল্পনার সময় শুধু ঢাকা শহরকে নিয়ে ভাবলে চলবে না, বৃহত্তর জায়গা নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে এবং এই পরিকল্পনাগুলোর সমন্বয় করতে হবে।