শনিবার, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
২৭ নভেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

কটু কথার ঘা

রওনক খান: অকস্মাৎ একটি সুনসান স্তব্ধ দুপুরে মেয়েটি অবিশ্রাম্ত অশ্রু ঝরিয়ে চলেছে। বছর তিরিশের এক আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত গৃহবধূ। যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। বিবাহিত জীবনে সেটিই প্রথম। কোন সভ্য সমাজের একটি শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষের মুখে এমন নোংরা, কদর্য ইঙ্গিতপূর্ণ কটাক্ষে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে প্রায় সদ্য এই গৃহিণী।  

প্রথম দুএকটা বছর স্বামীর আচরণে কিছু কিছু অস্বাভাবিকত্ব দেখলেও, বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি মেয়েটি। ভেবেছে ব্যক্তি বিশেষে স্বভাবের এমন ভিন্নতা থাকতেই পারে।

এরপর থেকে প্রায়শই কারণে অকারণে স্বামীর কটু কথার বাণে তাকে জর্জরিত হতে হয়। তথাকথিত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামীটি নির্বিকার চিত্তে স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত কদর্য, নোংরা ইঙ্গিত পূর্ণ কথার ঘায়ে দগ্ধ করে।

বিষয়টি যেন স্বামী পুরুষটির কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। স্ত্রীর উপর তার অন্যান্য অধিকারের মতনই সময় অসময়ে তাকে কুৎসিত  বাক্যবাণে বিদ্ধ করাও স্বামী হিসেবে তার একটি বৈধ অধিকার।

কেটে যাচ্ছিল তাদের দাম্পত্য ভালোমন্দে মিশিয়ে। এইসব দিনযাপনের ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটি লক্ষ্য করেছে বেশ কয়েকবার, তার স্বামী প্রবরটি প্রায়শই নারীদের নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করে। যেন জগতের তাবৎ নারী জাতি দুশ্চরিত্র লম্পট, পরকীয়ায় পটু। কেবল পুরুষ মাত্রই চরিত্রবান, ধোয়া তুলসীপাতা।

দিনে দিনে সংসার, সন্তানের পাকে জড়িয়ে, নানাবিধ জাগতিক সমস্যায় মেয়েটির গৃহিণী জীবনের ব্যস্ততা বাড়ে। সংসারের দায়িত্ব দুজনে ভাগাভাগি করেই পালন করছে। সে সব কিছুইতে স্বামীর সহযোগীতা সম্পূর্ণভাবেই পেয়ে চলেছে। কোথাও তেমন কোন সমস্যা নাই। স্বামী তার  স্ত্রীর প্রতি, সন্তানদের প্রতি সব রকম দায়দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন করে চলেছে। স্ত্রী কে যথেষ্ট ভালোও বাসে।

তবে সমস্যা কোথায়? সেটার সূত্রপাত ঘটেছিল, যেদিন প্রথম মনোমালিন্যের একপর্যায়ে স্বামী, স্ত্রীকে লক্ষ্য করে নোংরা একটি মন্তব্য ছুঁড়ে দিল।

সেদিন মেয়েটির মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো আর মরা যায়না। দুটো সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আবার মনকে শক্ত করে।

এরপর থেকেই সামান্য কোন একটি বিষয়ে অশান্তি বা ঝগড়ার এক পর্যায়ে স্ত্রীকে কুৎসিত গালি দিয়ে তার স্বামী ঝগড়ায় ইতি টেনেছে। তরুণী বধূ প্রত্যেকবার বাক্যহারা হয়ে মাথা নত করেছে। লজ্জায় ঘৃণায় বারবার নিজেকে ধিক্কার দিয়েছে।

ভয়ে ভয়ে সর্বদা স্বামীর মন জুগিয়ে চলতে চেয়েছে, যেন তাকে ঐ নোংরা শব্দগুলো শুনতে না হয়। কথাগুলো কাঁটার মত তার মনকে নিরন্তর খুঁচিয়ে চলে। তার এতদিনের অর্জিত আত্মমর্যাদাবোধকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। ক্রমেই একজন সদা হাসোজ্জ্বল প্রাণবন্ত দু'সন্তানের জননী হয়ে পড়ে নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রভ, বিমর্ষ। ঠোঁটের আগায় ঝুলে থাকা সার্বক্ষণিক হাসিটিও কখন যেন মিলিয়ে যায়।এক  প্রাণহীন যান্ত্রিক সংসার জীবনে ক্রমেই সে হাঁপিয়ে ওঠে। বাচ্চা দুটোর মধ্যেও একধরনের পরিবর্তন ঘটে। মায়ের মনের কালো মেঘের ছায়া নিষ্পাপ শিশুদুটিকে সর্বদা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখে। সমবয়সী অন্যান্য বাচ্চার তুলনায় তাদের মাঝে স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্যের অভাব দেখা দেয়। শিশুদুটো কিছুটা অপ্রতিভ, আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে বেড়ে উঠতে শুরু করে।

অনুমান করা যায়, প্রচলিত সামাজিক বলয়ে বেড়ে ওঠা এই তরুণীটি, তার সাথে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এমন ন্যাক্কারজনক আচরণের কোন প্রতিকার, তার বাবা মা বা অন্যকোন প্রিয়জনের কাছ থেকেও পায়নি। বদলে পিতৃপরিবার থেকে পেয়েছে সেই বহুপুরাতন একঝুলি উপদেশ বাণী, তুমি মেয়ে তাই মেনে নাও, বা মানিয়ে নাও। ফলে মেয়েটি ক্রমেই তলিয়ে গেছে সংসার নামের একটি গভীর খাঁদে।

মনে পড়ে  কবি জসিমউদদীনের "কবর" কবিতার দুটো পংক্তি ---

"হাতেতে যদিও না মারিত তারে
শত যে মারিত ঠোঁটে"।"

হাতের মারের চেয়ে মুখের মারের আঘাত কোন অংশেই কম নয়।  একটি সুস্থ সুন্দর জীবনকে ধীরে ধীরে বিষিয়ে তুলতে "ভারবাল এ্যবিউজ" বলাবাহুল্য একটি  ধিক্কৃত পন্থা।

যদিও ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বলতে আমাদের প্রথমেই মনে আসে শারীরিক নির্যাতনের কথা। এর বাইরেরও কত নারী যে নিরাপদ চার দেওয়ালের মাঝে নানাভাবে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার হিসেব কে রাখে।

একথা সত্য, যে দেশে নারীর সাথে ঘটে যাওয়া শারীরিক সহিংসতাগুলোকে দুর্বল বিচারিক কাঠামোর কারণে বিচারের আওতায় আনা যায় না সেখানে মানসিক নির্যাতনের বিচার প্রত্যাশা করাটা তো প্রায় সোনার পাথর বাটি।

কিন্তু একজন আদ্যোপান্ত সঠিক মানুষকে যখন অহরাত্র নানাবিধ নোংরা, অশ্রাব্য কথার ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়, শারীরিক নির্যাতন বা লাঞ্ছনার চেয়ে তার যন্ত্রণা কোন অংশে কম নয়। বরং শরীরের আঘাতগুলো প্রমাণ করা সহজ, কিন্তু অন্তরের ক্ষরণ অনেক গভীরে দাগ রেখে গেলেও তা অপ্রমাণ্য। যা কেবল দিনে দিনে একজন মানুষকে বিষন্নতার বিবরে নিক্ষেপ করে।

দাম্পত্যের শুরুতেই যদি এই মেয়েটি স্বামীর কদর্য অভ্যাসটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে, তাকে সংশোধনের চেষ্টা করত অথবা এই দুঃসহ দাম্পত্য থেকে বেরিয়ে এসে নতুন একটি সুস্থ জীবনের পথ খুঁজে নিত তবে সেটিই হয়তো হত উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

কথাগুলো বলা যত সহজ, বহুদিনের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় একটি আগাগোড়া মধ্যবিত্ত মানসিকতার মেয়ের পক্ষে সেটার বাস্তবায়ন  ঠিক ততটাই কঠিন। এদেশের ঘরে ঘরে খুঁজলে এমন হাজারো নারীকে পাওয়া যাবে, যারা প্রতিনিয়ত স্বামী বা বৈবাহিক সম্পর্কিত নানান আত্মীয়ের দ্বারা নানাভাবে কটু, নোংরা, কদর্য কথার ঘায়ে জর্জরিত হচ্ছে। অথচ প্রতিবাদ করবার, বা নিজের প্রতি এমন অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মত সাহসটুকু একজীবনে অর্জন করে উঠতে পারে না। চাইতে পারেনা এর কোন যথোপযুক্ত প্রতিকার। সমস্যাটি তাই চারদেওয়ালের মাঝেই নিরন্তর প্রতিধ্বনিত হয়।

উইমেনআই২৪//এএসইউ//

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
ছোটবেলায় আমরাও অর্ধেক ভাড়ায় চলেছি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী         এবার সাহসী সামান্থা         মহাসড়কে টোল আদায়ে বিল পাস         বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলন হচ্ছে না         স্মার্টফোন ব্যবহারে চোখের ক্ষতি এড়াতে         টিকা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে বউ-শাশুড়ির প্রাণহানি         মহামারীতে প্রবাসী আয়েই শক্ত অর্থনীতি: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী         ডব্লিউসিআইটি ২০২১ :তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ব আসরে ডিজিটাল বাংলাদেশ         করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন' নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?         বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম, কমতে পারে দেশেও         করোনায় আজও মৃত্যু কমেছে         প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে বাংলাদেশের মেয়েরা         গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আরও ৮৭ জন নতুন রোগী ভর্তি         নারী আন্দোলনের ইতিহাস         আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালু         পেছন থেকে কেউ নজর রাখলে সতর্ক করে দেবে ক্রোমবুক         চট্টগ্রামে আবারও ভূমিকম্প         আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রকে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানো: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী         দেশ শৃঙ্খলমুক্ত গণতন্ত্রের ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে: ওবায়দুল কাদের