বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
০২ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

ডেঙ্গুতে আতঙ্ক নয় : চাই বিশেষ সতর্কতা

তানজীনা পারভিন: বছরের বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এডিস মশার কারণে এ রোগ হয়। তাই মশার কামড় থেকে বাঁচতে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। করোনার মতোই আক্রমণ শুরু করেছে ডেঙ্গু। দিনের মশা রাতদিন নাকাল করে ছাড়ছে রোগীদের। যখন-তখন হাসপাতালে দৌঁড়াতে হচ্ছে তাদের। এ থেকে নিষ্কৃতি প্রয়োজন। রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। নতুন এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরি। চলতি বছর ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৩৪৩ জন। মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৮ জন। অক্টোবর মাসে ১৮ জন, নভেম্বর মাসের ১১ জনের মৃত্যু হয়।  

নভেম্বরে মাসের এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই হাজার ছয়শত আটাশি জন ভর্তি হন। গত মাসে রোগী ভর্তি হয়েছেন পাঁচ হাজার চারশত আটান্ন জন। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ভর্তি ছিল পাঁচশত তেতাল্লিশ জন রোগী। এসব রোগীর বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ২৪ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ১০ বছরের মধ্যে, এর মধ্যে ২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর বয়স এক বছরের মধ্যে, ১৬ দশমিক ৮ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে, ১৯ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ৪১-৫০ বছর, ৫ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ৫১-৬০ বছর  এবং ৬০ বছরের ওপরে রয়েছে ৪ শতাংশ রোগী। প্রকাশিত খবরে আরো বলা হয়েছে, চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ গত মাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন না করলে যে-কেউ এ সময় এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এ সময়টা মশার প্রজননের প্রধান মৌসুম। কিছুদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। বৃষ্টিপাতের কারণে এখানে সেখানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশালার্ভা ছাড়ে। তাই ডেঙ্গু রোগ সৃষ্টিকারী মশাসহ সবরকমের মশার প্রজনন বেড়ে যায়। বাড়িতে বা বাড়ির আঙিনায় কোথাও যেন পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া অত্যাবশ্যক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি মহামারি যদি একত্রে চলমান থাকে, তাহলে মানুষের জীবনের জন্য একটি প্রবল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আবার করোনাভাইরাসের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ মিলে যাওয়ায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন বলেও ধরে নিচ্ছেন। ফলে জটিলতা আরো বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বছর এপ্রিল ও মে মাস থেকেই বেশি বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা-এই তিনটা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক বিধায় এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হতে পারে এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের ছিলো। তাঁরা ধারণা করেছিলেন সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি থাকবে, কিন্তু নভেম্বর প্রায় শেষ এখন, তারপরও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ায়। বছরের যে-কোনো সময় এ রোগ হতে পারে, তবে বর্ষাকালে মূলত এর প্রাদুর্ভাব বেশি থাকে। স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। এ মশার গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। শহর অঞ্চলে এ রোগ বেশি দেখা যায়। যারা একবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, পরবর্তীতে তাদের এ রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটি বেশি দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান লক্ষণসমূহের মধ্যে তিন থেকে সাতদিন ধরে শরীরে উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজমান থাকে, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা এবং সারা শরীরের গিঁটে গিঁটে ব্যথা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া জ্বরের দ্বিতীয় দিনে অথবা জ্বর কমে যাওয়ার (চার থেকে সাত দিন) পর চামড়ার নীচে ছোটো ছোটো লাল ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। কৈশিকনালি ভেঙে যাওয়ার কারণে ছোটো ছোটো লাল দাগ দেখা দিতে পারে শরীরে, যা চাপ দিলেও মিশে যায় না। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক লক্ষণের মধ্যে দাঁতের গোঁড়া বা নাক দিয়েও রক্ত বের হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর মৃদু বা হাল্কা থেকে মারাত্মক ধরনের হয়ে থাকে। মৃদু ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে উপরের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের দুটি মারাত্মক ধরন হচ্ছে; ডেঙ্গু হেমোরেজিক ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের (dengue hemorrhagic fever) শুরুটা হয় মৃদু ডেঙ্গু জ্বরের মতোই। তবে পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা অধিকতর নাজুক হতে শুরু করে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের সাধারণ লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপশি আর যে সমস্যাটি হয়, তা হলো রক্ত জমাটবাঁধতে সাহায্যকারী রক্ত কোষের সংখ্যা কমে যাওয়া। এমনটা হলে চামড়ার নীচে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে।

ডেঙ্গু জ্বরের সবচেয়ে মারাত্মক ধরনটি হচ্ছে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (dengue  shock syndrome)। এরূপ ডেঙ্গু জ্বরের সাধারণ লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আর যে সমস্যাটি হয়, তা হলো তীব্র পেটব্যথা, ঘনঘন বমি, জ্ঞান হারানো, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়ার মতো ঘটনা।

ডেঙ্গু জ্বরে অতিরিক্ত কৈশিকনালি ভেঙে যাওয়ার ফল হিসেবে অনেকের বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে। যার ফলে রক্তনালিতে ফ্লুইডের পরিমাণ কমে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্তের সরবরাহ কমে যায়। ৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এ সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের আশংকা বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রোগী শক-এ চলে যেতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে এসব লক্ষণ এবং নীচের আশঙ্কা দেখা দিলে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতলে ভর্তি করতে হবে: প্রচণ্ড পেটব্যথা, বমি, একের অধিক স্থান দিয়ে রক্তপাত, প্রস্রাব গাঢ় ও পরিমাণে অল্প হওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট এবং তিনদিনের বেশি ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কেননা দুর্বল শারীরিক সামর্থ্যের কারণে তাদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে। রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাননি। অনেক সময় বুঝেও উঠতে পারে না, যদিও রোগের লক্ষণগুলো দেখে ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। তথাপি চিকিৎসকগণ এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিবিসি টোটাল প্ল্যাটেলেট কাউন্ট, অ্যান্টি ডেঙ্গু অ্যান্টিবডিসহ প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা করাতে পারেন।

মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু জ্বর সেরে ওঠার সময়ও কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ সময় সারা শরীরে চুলকানিও হতে পারে এবং হৃদস্পন্দন কমে যেতে পারে। এছাড়া হতে পারে ফ্লুইড ওভারলোড যা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেললে খিঁচুনি হতে পারে। এতে করে অনেক সময় রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। প্রাথমিক চিকিৎসা প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ দিয়ে শুরু হয়। তবে চিকিৎসকগণ রোগের লক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও পরামর্শ অনুসারেই চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিৎ। রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করা উত্তম। ব্যথানাশক ঔষধ সেবনে ডেঙ্গু রোগীদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই নিজ থেকে কখনো ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়া উচিত নয় কোনোভাবেই। রোগীর পানিশূন্যতা প্রতিরোধে রোগীকে প্রচুর স্যালাইন, ডাবের পানি, জুস ও অন্যান্য তরল খাবার দিতে হবে। চিকিৎসকগণ প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইনও দিয়ে থাকেন। এছাড়া ঘাটতি পূরণের জন্য রক্ত দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। আক্রান্তের সঠিক পরিচর্যা না হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী ২০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যদিও এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর এ  সংখ্যা শতকরা ১ ভাগের চেয়েও কম।

স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো এ রোগ থেকে বাঁচার জন্য মশার কামড় থেকে নিরাপদ থাকতে হবে এবং ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে কতিপয় বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আঙিনাসহ আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ফুলের টব- নারিকেলের মালা, পরিত্যক্ত বালতি, ইত্যাদিতে পানি যেন জমে থাকতে না পারে। মশা নিয়ন্ত্রণে ঔষধ ব্যবহার করাসহ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই সবসময় মশারির নীচে রাখতে হবে। কেননা, আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে কোনো সাধারণ এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং এই মশা যখন আরেকজন সুস্থ মানুষকে কামড় দেয়, তখন সেও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়।

সব কথার শেষ কথা হচ্ছে, শুধু করোনা নিয়ে বিচলিত এবং সচেতন থাকলেই হবে না, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরো জোরালো ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে সকলকে ডেঙ্গু সুরক্ষার বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। তাই জ্বর হলেই করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষা করাটাও জরুরি। ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত না হয়ে তাই সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।

উইমেনআই২৪//এএসইউ//

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
এইচএসসি পরীক্ষা বৃহস্পতিবার শুরু, মানতে হবে ১৬ নির্দেশনা         জনগণকে ‘কম খাওয়ার’ নির্দেশ দিলেন কিম জং উন         দেশে ফিরেছে নারী দল         বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তিতে নতুন অধ্যায়ে দেশ         সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন         উড়োজাহাজের ধাক্কায় ২ গরুর মৃত্যু, ৪ আনসার প্রত্যাহার         আরো ১২১ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে         গ্রেপ্তার ভয়ে পুরুষশূন্য গ্রাম, আতঙ্কে নারী-শিশু         বৈশ্বিক কোভিড সহনশীলতা সূচকে ১৮ ধাপ উন্নতি বাংলাদেশের         এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ডিএমপির যেসব নিষেধাজ্ঞা         নভেম্বরে ৩২৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন শিকার         নেত্রকোণায় দাদন ব্যবসায়ীর হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন         ‘ঠিকানাহীন’ শোভা এখন বুয়েটে         ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দল         শিক্ষা-গবেষণা ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান         ২৪ ঘণ্টায় ২৮২ জন শনাক্ত         নবাবগঞ্জে বিশ্ব এইডস দিবস পালন         সৌদি আরবে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন শনাক্ত         শিক্ষার্থী নাঈমের নামে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের ঘোষণা         শ্লীলতাহানির মামলায় নারাজির আবেদন পরীমনির