বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
০২ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

ভাঙা কাঁচে স্বপ্ন

সুলতানা রহমান: শুভ্রের কেবিন নাম্বার তেরোশ উনসত্তর। নাম্বারটার তেরো সংখ্যা নিয়ে সে ভাবে। আনলাকি থারটিন। সবগুলো অংক যোগ করলে হয় উনিশ। উনিশও কি আনলাকি নাম্বার? শুভ্র অবশ্য এগুলো বিশ্বাস করে না। কিন্তু মাঝে মাঝে এসব নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে।
অনেক আগেই শুভ্রের ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু সে বিছানা থেকে নড়েনি। একটু এপাশ থেকে ওপাশও করেনি। তাকে দেখলে যে কেউ ভাববে সে এখন গভীর ঘুমে পড়ে আছে।
শুভ্র শুয়ে শুয়ে নার্স মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করে। মেয়েটার নাম লী। অনেকটা সময় পরে লী আসে।
- গুড মর্নিং শুভ্র 
- মর্নিং লী 
- আজ কি তোমার মন ভালো?
শুভ্র হাসে, মৃদু হাসি। ওর মন ভালো কিনা ও জানে না।
- আজ কী বার লী? এই প্রশ্ন শুভ্র প্রতিদিনই করে। 
- আজ সানডে শুভ্র, উইকএন্ড।
মেয়েটা ওকে ধরে ধরে টয়লেটের কাছে নিয়ে যায়। ভেতরে ঢুকে প্রতিদিনই সে দরজা লাগায়, প্রতিদিনই লী ওকে নিষেধ করে। দরজা খোলা রেখে একটা তরুণীর সামনে বাথরুমে যাওয়া - এটা শুভ্রের কেমন যেন লাগে। অনেকক্ষণ সময় লাগিয়ে দেয় সে বাথরুমে। তারপর যখন ও দরজা খোলে তখনই লী হাত বাড়িয়ে দেয়। ওর হাত ধরে আবার সে বিছানায়।
- শুভ্র, আজ ফুলদানিতে রোজ দিয়েছি।
শুভ্র মাথার কাছেই রাখা টেবিলে হাত দেয়। স্পর্শটা বড় কোমল ঠেকে।
- কী রঙ? 
- সবগুলো রেড।
শুভ্রের চোখের সামনে দুলে ওঠে লাল গোলাপ। অনেকগুলো। গভীর মায়ায় হাতটা অনেকক্ষণ ছুঁয়ে রাখে।
ওকে খাইয়ে, ঔষধ দিয়ে মেয়েটি চলে যায়।


অনেকদিন ধরেই শুভ্র সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালে আছে। একটা একসিডেন্টে ওর মাথা পুরোটাই ঝলসে যায়। কেউ ভাবতেই পারেনি ও আবার বেঁচে যাবে। ধীরে ধীরে ও সুস্থ হচ্ছে। তবে এখনো সে চোখে দেখতে পায় না। হাঁটা চলাও একা একা করতে পারে না।
সতেরো 'শ বেডের এই বিশাল হসপিটালটা কেমন শুভ্র দেখে নি। এই হসপিটালের বয়স দুশ বছরেরও অধিক। এই রুমেই হয়তো অনেক মানুষ মারা গেছে। তাদের মৃত আত্মারাও  হয়তো  ঘোরাফেরা করে। এটুকু ভেবেই তার শরীর একটু শিরশির করে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে আত্মা ঘোরাঘুরি করে না। ও যখন এখানে এসেছিলো তখন ও মৃতই ছিলো। এখন সে লীর হাত ধরে হেঁটে বেড়ায়।
ডক্টর বলেছে আর কয়েকটা দিন পরেই শুভ্র আগের মতো হয়ে যাবে। তখন আর লী কে লাগবে না। ও ভালো হয়ে আবার ওর বাসায় ফিরে যেতে পারবে।

বাসা! ভাবতেই তার বড় ঘর, এলোমেলো বিছানা, স্তুপ হয়ে থাকা কাপড় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ওর এখনই ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে হয়। সে স্পষ্ট মায়ের কথা শুনতে পায়! কী বলছে মা? একটু মনোযোগ দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু বুঝতে পারে না।
আরো কয়েকটা দিন কাটে। শুভ্র এখন নিজেই অনেক কাজ করতে পারে। বিছানা থেকে ডানে পা দিতে হয়, তারপর গুণে গুণে দশ পা হাঁটলে বাথরুম। বাথরুম থেকে বের হয়ে উল্টো দিকে পাঁচ পা হাঁটলে জানালা। জানালার পর্দা সরালেই আকাশ। শুভ্র অবশ্য আকাশ দেখতে পায় না। মাঝে মাঝে ওর খুব ইচ্ছে করে লী কে জিজ্ঞেস করতে, আকাশের এখন কী রঙ! কিন্তু ও সেটা করে না। ও নিজেই ভেবে নেয় আকাশের রঙ এখন গাঢ় নীল। অথবা গোধূলীর আকাশ। পর্দা সরালেই ওর খুব চিত্রার কথা মনে পড়ে। ওর ব্যাচমেট ছিলো। কোচিংয়ে ফিজিক্স পড়তো একত্রে। হাসলে গালে টোল পড়তো। ওই বয়সের সবগুলো ছেলেই মনে মনে চিত্রাকে নিয়ে ভাবতো! ও তো নিজেই কত কিছু ভাবতো! একবার স্বপ্নে দেখেছিলো চিত্রার হাতে ও মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছে। কী ছেলেমানুষি স্বপ্ন! ও কেন মেহেদি পরাতে যাবে! যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই কখনো মেহেদি পরে নি। পরানোর কথা তো আসেই না।
আরো যে কত কত জনকে মনে পড়ে। যারা স্মৃতির পর্দা থেকে সরে গিয়েছিলো তারাও চলে আসে। একবার ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ওদের সাথের একটা ছেলেকে ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে পা ভেঙে দিয়েছিলো। সেই ছেলে অনেকদিন বিছানায় ছিলো। অনেকবার চেষ্টা করেও শুভ্র তার নাম  মনে করতে পারে না। ওই ছেলেটার জন্যও ওর দুঃখ লাগতে থাকে।
এখন ওর দিন কাটছে 'লী' নামে একটা বিদেশী মেয়ের সাথে। কখনো কি ও ভেবেছিলো এরকম!
লীর ইংরেজীটা শুনতে ভালো লাগে শুভ্রের। 
ঘুমের ঔষধ খাইয়ে বাতিটা নিভিয়ে শুভ্রের মাথার পাশে কিছুক্ষণ বসে।
- লী, অনেকদিন নিজেকে দেখি নি। আমি কি দেখতে ভীষণ খারাপ হয়ে গেছি?
লী কোন কথা বলে না। শুধু ওর হাতটা শুভ্রের চুলের ভেতরে মমতার স্পর্শ দিয়ে যায়।
শুভ্র একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।ও জানে, ওর পুরো মুখের চামড়াই পুড়ে গেছে। মাঝে মাঝে ও হাত দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে। কোন পুড়ে যাওয়া মুখ ওর মনে পড়ে না।
আচ্ছা, লী মেয়েটা দেখতে কেমন? তার গায়ের রঙ ফর্সা এটা শুভ্র আন্দাজ করে। এখানকার সব মেয়েরাই ফর্সা হয়!  কিন্তু ওর চোখ দেখতে কেমন? ওর কি এখন চোখ ভেজা? হয়তো ভেজা নয়। শুভ্রের মনে হচ্ছে।
সব মেয়েই কি মাঝে মাঝে মা হয়ে যায়? তার খুব মার কথা মনে পড়ে। অন্ধকার রুমটাতে তার খুব কষ্ট হতে থাকে।
- লী, একটা জিনিস চাইবো । বলো, দিবে? 
-বল
-একটা সিগারেট খেতে চাই।
- হসপিটালে সিগারেট খাওয়া যায় না, তুমি এটা জানো।
সেদিন তার অনেক রাত অবধি ঘুম আসে না।
কষ্টের তীব্রতা তার নিকোটিনের চাহিদাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে।


প্রতিদিনই এগারোটায় শুভ্রকে ফোনে কথা বলতে দেয় মায়ের সাথে। তিন থেকে চার মিনিট। এই তিন থেকে চার মিনিটের পুরো সময়টায় ও কান্না শুনতে পায়। মায়ের কান্না শুনতে ওর ভালো লাগে না। সব মা কি এরকম কাঁদে? মায়ের কান্না শুভ্রকে বার বার মনে করিয়ে দেয় ও ভয়ানক অসুস্থ ছেলে। প্রতিদিনই শুভ্র ফোন কানে দিয়ে অপেক্ষা করে। মনে মনে বলে, আজ তুমি কেঁদো না মা।  আজ  একটু হেসে হেসে কথা বলো।  কিন্তু শুভ্রের মায়ের কাছে সেটা পৌঁছায় না। তিনি প্রতিদিনের মতোই কাঁদেন। প্রতিদিনের মতোই শুভ্রকে মনে করিয়ে দেন তার অসুস্থতার কথা।
লং ডিসটেন্স কল, হসপিটাল, চিকিৎসা ৃ নিশ্চয়ই অনেক খরচের ব্যাপার। শুভ্র এসব ভাবতে চায় না। অর্থহীন এসব চিন্তা তাকে আরো অসুস্থ করে।
শুভ্রের শুধু লীর সাথেই কথা বলতে ভালো লাগে। মেয়েটা কখনোই ওকে বুঝতে দেয় না ও অসুস্থ। বোধ হয় ওরা খুব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ওর খুব চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয়। যদিও চিঠি লেখা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। ওর পুরো একটা ব্যাগ ভর্তি চিঠি। সেই মেয়েটা তাকে  অনেক চিঠি লিখতো। শুভ্রও অনেক চিঠি লিখতো। একটা চিঠি যে কত আনন্দ দিতে পারে! শুভ্র একটা চিঠি লিখবে। কাকে লিখবে? কোন নাম ছাড়াই লিখবে?
- লী, আমি একটা চিঠি লিখবো। তুমি আমাকে একটা সাদা কাগজ আর কলম দিও।
- ঠিক আছে শুভ্র।
সেদিন রাতেও তার ঘুমের ঔষধ কাজ করতে দেরি করে। ও মাথার কাছে হাত দেয়। খাতা আর কলম হাতে ঠেকে। আধশোয়া হয়ে বসে খাতার পাতা ধরে রাখে। অন্ধকার রুমে বসে একটা চিঠি লিখতে চেষ্টা করে। কিন্তু কাকে লিখবে ভেবে পায় না। অন্ধকারে চিঠি লিখতে ওর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ওর কাছে দিন বলে কিছু নেই।
পরের দিন শুভ্রকে আই সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। শুভ্রের একান্ত ইচ্ছায় লীকেই শুভ্রের নার্স হিসেবে রাখা হয়।  এখানে থাকবে ও দিন তিনেক। তারপর ও ভালো হয়ে যাবে। ভালো হয়ে যাবে তো?
- শুভ্র, তুমি ভালো হয়ে কাকে দেখতে চাও প্রথমে? 
তোমার মা? ভাই? নাকি তোমার প্রেমিকা?
শুভ্র বেশ কিছুক্ষণ সবার মুখ মনে করে। কিন্তু তার কাউকেই দেখতে ইচ্ছে করে না।
- লী, আমি আলো দেখতে চাই। প্রতিনিয়ত রাতের নিকষ কালো দেখতে দেখতে আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছি। একটুখানি আলোর জন্য আমি জীবনটা দিয়ে দিতে রাজী আছি।
এটুকু বলেই শুভ্রের মনে হয় ও কি অনেকটাই স্বার্থপর হয়ে গেছে? এতটা দিন এমন থাকতে থাকতে কি সে পুরোটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে?
তখনই লীর মমতার হাত ভরসা দেয়। ওর মনে হতে থাকে, স্বার্থপরতা খারাপ কিছু নয়।
পরদিন যখন ওর চোখ খুলে দেওয়া হয় ওর মনে হতে থাকে অসংখ্য আলোকরশ্মি সব ঝাঁপিয়ে পড়েছে একসাথে। ধাতস্থ হওয়ার পর আবার যখন চোখ খুলে তখন শুভ্র শুধু বলে, কী সুন্দর! কী সুন্দর!
লী অবাক হয়ে বলে, কী বলছ শুভ্র? 
শুভ্র শব্দ করে হাসে। 
-দেখ লী, আলো অনেক সুন্দর! আলো সুন্দর!
শুভ্র ভাবে, একটা শিশুও কি পৃথিবীর  প্রথম আলো এভাবে দেখে?
লী কে দেখে শুভ্র খুব অবাক হয়। মেয়েটি খুব সুন্দর! ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
- লী, আমি কি তোমার হাতটা একটু স্পর্শ করতে পারি?
লী তার হাতটা বাড়িয়ে দেয়। শুভ্র হাতটা অনেকক্ষণ ধরে রাখে।
বেশ কিছুদিন এই হাত তার নির্ভরতার সঙ্গী ছিলো।  আজ সে গভীর কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসায় হাতটা ধরে রাখে।    

 

উইমেনআই২৪//এলআরবি//
 

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
এইচএসসি পরীক্ষা বৃহস্পতিবার শুরু, মানতে হবে ১৬ নির্দেশনা         জনগণকে ‘কম খাওয়ার’ নির্দেশ দিলেন কিম জং উন         দেশে ফিরেছে নারী দল         বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তিতে নতুন অধ্যায়ে দেশ         সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন         উড়োজাহাজের ধাক্কায় ২ গরুর মৃত্যু, ৪ আনসার প্রত্যাহার         আরো ১২১ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে         গ্রেপ্তার ভয়ে পুরুষশূন্য গ্রাম, আতঙ্কে নারী-শিশু         বৈশ্বিক কোভিড সহনশীলতা সূচকে ১৮ ধাপ উন্নতি বাংলাদেশের         এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ডিএমপির যেসব নিষেধাজ্ঞা         নভেম্বরে ৩২৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন শিকার         নেত্রকোণায় দাদন ব্যবসায়ীর হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন         ‘ঠিকানাহীন’ শোভা এখন বুয়েটে         ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দল         শিক্ষা-গবেষণা ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান         ২৪ ঘণ্টায় ২৮২ জন শনাক্ত         নবাবগঞ্জে বিশ্ব এইডস দিবস পালন         সৌদি আরবে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন শনাক্ত         শিক্ষার্থী নাঈমের নামে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের ঘোষণা         শ্লীলতাহানির মামলায় নারাজির আবেদন পরীমনির