রবিবার, ২ কার্তিক ১৪২৮
১৭ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপে কমছে বাল্যবিয়ে

সালমা আফরোজ:

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থীর সঙ্গে একজন শিক্ষকের বিয়ে ঠিক হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়ে এ বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন।

টাঙ্গাইলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খায়রুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৮ ধারায় বর ও কনের বাবাদের জরিমানা করা হয়।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় একদিনে ১২ ও ১৩ বছর বয়সের দুই ছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান জানান, বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসন সব সময় তৎপর রয়েছে। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বিয়ে দুটি বন্ধ করা হয়।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপিনচন্দ্র বিশ্বাসের হস্তক্ষেপে বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পেল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তিনি জানান, ছাত্রীর বাবা নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে না দিতে সতর্ক করা হয়।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার একটি গ্রামে ১৫ বছরের এক কিশোরীর বাল্যবিয়ে হচ্ছিল। এ সময় বিটেশ্বর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ হন। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে এ বিয়ে বন্ধ করে। দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম খানের পরামর্শে, মেয়েটির আইনগত নির্ধারিত বয়স হলে ওই ছেলের সঙ্গেই বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে ঠিক হয়।

এভাবেই দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা যেখানেই বাল্যবিয়ে হচ্ছে তারা ছুটে যাচ্ছে তা বন্ধ করতে। এভাবেই মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেবেন না মর্মে কনের বাবা-মায়ের কাছ থেকে মুচলেকা নিচ্ছে। তারা নাবালিকাদের অভিভাবকদের ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়েকে বিয়ে দেয়ার কুফল ও রাষ্ট্রীয় আইনে এ ধরনের বিয়ের স্বীকৃতি নেই, সেটা বুঝিয়ে বলে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, সরকারের শক্তিশালী অবস্থান ও কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে কমে আসছে। ২০১৫ সালের বিআইডিএস এর জরিপ অনুযায়ী ১৫ বছরের নিচে বিয়ের শতকরা হার ছিল ২৩.৮ শতাংশ ছিল। ২০১৭ সালে বিআইডিএস জরিপ অনুযায়ী তা কমে হয়েছে ১০.৭ শতাংশ। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে নিরোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রধানতম প্রাধিকার। এ জন্য মন্ত্রণালয় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

বাল্যবিয়ে রোধে শিশু অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর ঘোষণা দিয়েছে তারা। এ অ্যাপ ১৮ বছর বয়স হয়নি এমন মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করতে ‘বিশেষ প্রভাব’ রাখবে বলে তারা আশা করছে। নতুন মোবাইল অ্যাপটি বিয়ে নিবন্ধনের সাথে জড়িত ঘটক, কাজী, ধর্মীয় এবং আইনি ব্যক্তিদের ডিজিটাল ডাটাবেজের সহায়তা দেবে। প্ল্যান বাংলাদেশের পরিচালক সৌম্য গুহ বলেন, বিয়ের প্রক্রিয়ার সাথে প্রাথমিকভাবে জড়িতদের যদি প্রথমেই তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে কেউই কম বয়সে বিয়েকে আইনিসিদ্ধ বা নিবন্ধনের সাথে যুক্ত হবেন না। পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর ৬ মাসে এ অ্যাপ দিয়ে ৩ হাজার ৭৫০ বাল্যবিবাহ রোধ করা গেছে দাবি করেন সৌম্য গুহ।

অ্যাপটি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেল মুহাম্মদ আব্দুল হালিম বলেন, আমি মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছেন, এ অ্যাপটি তাতে সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখবে৷

ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে, বিশ্বজুড়ে গত এক দশকে বাল্যবিয়ে পনের শতাংশ কমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সেখানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে এখন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাল্যবিয়ের হার বাংলাদেশেও খুব বেশি ছিল, সর্বশেষ ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হতো। জাতিসংঘ বলছে, বাল্যবিয়ের সংখ্যা কমেছে। ঢাকায় ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা সোনিয়া সরদার বলেছেন, নতুন এ রিপোর্টে তারা দেখছেন বাংলাদেশেও বাল্যবিয়ের হার কমছে। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অল্পবয়সী মেয়েরাও এখন তাদের বিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসছে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসন এবং কমিউনিটিতে যেসব সংগঠন কাজ করে তারাও এগিয়ে এসেছে।

সাধারণত দেখা যায় বেসীর্ভাগ শিক্ষিত পরিবারে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। এই সমস্যা দূর করতেই বাবা মা মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন। তাই অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় মেয়েরা পড়াশোনা করা সুযোগ পায় না। প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় বিবাহিত কিশোরীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সমস্যায়ও ভোগে। কিশোরী বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এসব নারী মানসিক, শারীরিক ও যৌনজীবনে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা পরবর্তীতে জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে না। এতে দেখা যায় দেশ ও জাতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে এক হয়ে বাল্যবিয়ে রোধ করতে হবে। সমাজ থেকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দুর করতে হবে। একটি মেয়ে তার স্কুলজীবন পেরোনোর আগেই বউ হচ্ছে, মা হচ্ছে। জীবন সম্পর্কে যার কোন ধারণাই নাই সে সংসার-জীবনে প্রবেশ করে সকাল থেকে রাত শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। অথচ সমাজের অন্য মেয়েদের মতো শিক্ষিত, স্বাবলম্বী কিংবা সুন্দর জীবনযাপনের অধিকারী সেও হতে পারে। বাল্যবিয়ে রোধেই সম্ভব হবে অপরিণত গর্ভধারণ ও অকালমাতৃত্ব।

সামাজিক সচেতনতা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বাল্যবিয়ে রোধ এবং একটি শিশুকে অধিকারসচেতন নারী কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নারী নিজেই সচেতন হয়ে উঠেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় বাল্যবিয়ে রোধে কিছু কিছু সাহসী কন্যাশিশুরা এগিয়ে আসে। যখন এই শিশুরা বাবা মাকে বুঝিয়েও বিয়ে বন্ধ করতে পারে না তখন তারা প্রশাসনের সাহায্য পেতে থানায় হাজির হয়। অবশ্যই নারীদের বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আর তাহলেই এ ঘৃণ্য অভিশাপ থেকে নিশ্চিতভাবে কন্যাশিশুরা মুক্তি লাভ করবে। যখন দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও সমাজ এ বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, তখন বাল্যবিবাহের আড়ষ্টতা থেকে নারীরা বেরিয়ে আসবেন।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে অভিভাবক হিসেবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়েকে এবং ২১ বছর বয়সের আগে কোনো ছেলেকে বিয়ে দেবেন না। ছেলেমেয়েদের বোঝাতে হবে তারা যেন প্রাপ্তবয়সের আগে তাদের পছন্দে বিয়ে না করে। সেজন্য তাদের পাশে থেকে তাদের মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করতে হবে। একটা পরিবারের বাবা মাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে বিয়ে নয় বরং মেয়েশিশুকে শিক্ষিত ও সাবলম্বী করে তুলব। বিয়ের পাত্রী হিসেবে মেয়েকে গড়ে তোলার চেয়েও তাকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে মূল দায়িত্ব। প্রয়োজনে পড়াশুনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তার অংশগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে। মেয়েশিশু যেন পরিণত বয়সে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারে সে জন্য উৎসাহিত এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবেই আমাদের দেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে। শিক্ষিত মাই দিতে পারেন শিক্ষিত জাতি।

#পিআইডি শিশু ও নারী উন্নয়নে সচতেনতামূলক যোগাযোগ র্কাযক্রম (৫ম র্পযায়) প্রকল্প র্কাযক্রম।
  
 

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
বিএনপির বক্তব্যই প্রমাণ করে কুমিল্লার ঘটনায় তাদের ইন্ধন রয়েছে: তথ্যমন্ত্রী         অভিশাপ আর কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত যে মুক্তা         ওমরাহ যাত্রীদের জন্য নতুন যেসব নির্দেশনা         রাজধানীতে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার         ১০ কোটি বছর আগের মাছ ধরা পড়ল বড়শিতে!         আইরিশ লেখিকার বইয়ে ইসরাইলি বর্বরতার কাহিনী         পণ্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে ত্রিপক্ষীয় আস্থা সৃষ্টি জরুরি         আমদানির চাল আনতে হবে ৩০ অক্টোবরের মধ্যেই         নারীপক্ষ’র বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন         দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণার্থীদের সনদ বিতরণ         আইনের ফাঁক বাড়াচ্ছে বাল্যবিয়ে!         সরকার নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী         যুবলীগ কেন্দ্রীয় সদস্য গোলাম শাহরিয়ার রঞ্জুর সাথে যুক্তরাজ্য যুবলীগের মতবিনিময়         আ.লীগ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী সংবিধান সংরক্ষণের শপথ ভঙ্গ করেছেনঃ জি এম কাদের         ইভ্যালির ওয়েবসাইট-অ্যাপ বন্ধ         ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৮৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি         সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা চালিয়েছে: ওবায়দুল কাদের         ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ৭         মার্কিন প্রশাসনের নজরদারিতে ফেসবুক         হাতে কোরআন শরীফ লিখলেন জারিন         ৭ মাসে অ্যাক্টিভ রোগীর সংখ্যা সর্বনিম্ন , ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত ১৬৬