মঙ্গলবার, ১২ আশ্বিন ১৪২৮
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

নারীর পারিবারিক কাজের মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি

আফরোজা সরকার: নাজনীন সুলতানা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন নারী। চাকুরি করেন একটি বেসরকারি অফিসে। সপ্তাহে ৬ দিনের প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে তিনি বেশ আকর্ষণীয় বেতন পান। তবে অফিসে ৮ ঘণ্টা কাজের পরেও তাকে আরও ৫/৬ ঘন্টা কাজ করতে হয় পরিবারের জন্য। তার বিনিময়ে কিন্তু তিনি কোনো বেতন পান না। যদি তার এই বাড়তি অবৈতনিক কাজের পারিশ্রমিক অফিসের বেতনের সঙ্গে মুল্যায়ন করা হত তাহলে তার বেতন অফিসের বেতনের কাছাকাছি হতো।

ছাত্র জীবন থেকেই নানামুখী ঘাত প্রতিঘাত, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সমাজের সঙ্গে এক ধরনের লড়াই করেই তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয়েছে। স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি পদে, প্রতিটি ক্ষণে সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, বাবা-মায়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাসহ প্রচলিত সামাজিক সংস্কারের ধাপগুলো পেরিয়ে পৌঁছাতে হয়েছে নতুন এক জগতে। সেটি হল সংসার জগত। সংসার জগতে যেতে না যেতেই বেড়ে গেছে কাজের পরিধি। নতুন নতুন সব দায়িত্ব জমা হতে থাকে কাঁধে। খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে নতুন একটি পরিবারের সঙ্গে। স্বামীর পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ ছাড়াও অনেকেরই দায়িত্ব পড়ে গেছে তার ঘাড়ে। সবার দেখ-ভালের পাশাপাশি সংসারের রান্না-বান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা ছাড়াও সব কিছু সামলিয়েই তাকে নির্ধারিত সময়েই যেতে হয় অফিসে। অফিস থেকে ফেরার পর আবারও পরিবারের কাজ। বিছানায় যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এমনকি খাটের মশারিটাও টাঙাতে হয় তাকে। কিন্তু এসব কাজের কোনো স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন কোনটাই নেই।

আরেক গৃহবধূ শারমিন আখতার। তিনি কোনো চাকুরি বা ব্যবসা কোনটাই করেন না। দিন-রাতের ১৬ থেকে ১৮টি ঘণ্টা ব্যয় করেন তিনি স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্যদের কাজে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার কাজ শুরু হয়। থালা-বাসন পরিষ্কার, নাস্তা তৈরি, নাস্তা পরিবেশন, বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা থেকে শুরু করে তাদের দেখাশুনা, দুপুরের খাবার, বিকালের নাস্তা, সস্তানদের লেখা-পড়া করানো আবার রাতের খাবার-সবকিছু তাকেই করতে হয়। কিন্তু এজন্য তাকে কোনো বেতন বা পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। বরং এসব কাজের পরেও তাকে স্বামীর দয়ার ওপরই নির্ভর করতে হয়। একান্ত  প্রয়োজনের টাকাটাও স্ত্রীকে হাত পেতে নিতে হয় স্বামীর কাছ থেকে।

নারীর অবৈতনিক পারিবারিক কাজের স্বীকৃতি দেয়া সময়ের দাবি
সংসার জীবনে থেকে একজন নারী যখন ‘মা’ হন, তখন শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। সাংসারিক কাজকর্মের পাশাপাশি সন্তানকে লালন-পালন করা যে কষ্টকর কাজ-সেটা একমাত্র মা’ই জানেন। সন্তানের লালন-পালন, লেখাপড়া, স্কুল নিয়ে যাওয়া-আসা, খেলাধুলা সবকিছুই মা’কে করতে হয়। এক্ষেত্রেও প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই অসহযোগিতা থাকে। সংসার-সন্তান যেন নারীর একার দায়িত্ব। এসবই অবৈতনিক। তবে ‘সংসার সামলানোই নারীর কাজ’ প্রচলিত এই ধারণা অনেক আগেই পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক নানা ধারণার সঙ্গে এই দারণা ও মানসিকতাও পাল্টাচ্ছে। ঘর-সংসার সামলানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন অনেক বেশি। ঘর-সংসার সামলিয়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পেশাতেও নারীরা অংশহন করে চলেছে। সংসার, পরিবার, স্বামী-সন্তান, ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযত্ন করে অফিসে যেতে হয়। সেখানেও কাজের চাপ। এসব কিছুর পরও যেসকল নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন তাদের ওপর কিন্তু বাড়তি চাপেরও অভাব নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমেই তাকে মূল্যায়ন করা হয় বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে। সমাজের তৈরি করা মাপকাঠির নিচে হলেই কটাক্ষ?।

অবৈতনিক শ্রমে নারীর অবদান ৮১.৪ শতাংশ
‘সংসার-সন্তান সামলে যদি চাকরি করতে পারো তবে করো' প্রায় প্রতিটি  নারীকেই এধরনের কথা শুনতে হয়। স্বামী অফিস থেকে ফিরে খাবে- এ ভাবনা একজন স্ত্রীকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় রান্না ঘরে। পছন্দ মত রান্না করে অপেক্ষায় দণ্ডায়মান থাকতে হয় শত কাজের মধ্যেও। একসঙ্গে বাজার থেকে ফেরা স্বামীটি হাতমুখ ধুয়ে রিমোট হাতে টেলিভিশনের সামনে বসে পড়েন। অথচ স্ত্রীকে পোশাক পাল্টানোর আগেই ঢুকতে হয় রান্নাঘরে নাস্তা তৈরি করতে। এসব কোনোকিছুর বিনিময়েই তারা কোনো পারিশ্রমিক পান না। পরিবারের এত কিছু অবৈতনিক কাজ সামলিয়েও যারা চাকরির ভবনে প্রবেশ করেন তাদের জন্য শুরু হয় নতুন আর এক সংগ্রাম। এদের মধ্যে যারা সন্তান জন্মদানের পর আবার কাজে ফেরেন তাদের পোহাতে হয় নতুন আরেক বিড়ম্বনা। ছোট্ট শিশুটিকে বাড়িতে অন্যের কাছে রেখে অফিসে গিয়ে কাজ করা কত যে যাতনা তা কেবল একজন মা-ই বলতে পারবেন। তারপরও সব কিছু সামলিয়েই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। তাই এসব কাজের সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তা সময়ের দাবি।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ এবং নারী উভয়ের মোট বকেয়া কাজের মূল্য জিডিপির প্রায় ৪৮.৫৪ শতাংশ। তবে মোট অবৈতনিক শ্রমের মধ্যে নারীরা ৮১.৪ শতাংশ অবদান রাখেন, অন্যদিকে পুরুষরা রাখেন ১৮.৬ শতাংশ। তাই পুরুষ শাসিত এই সমাজে নারীর অবদানকে মর্যাদা দিতে এবং তাদের অবৈতনিক পারিবারিক কাজের অবদানকে আমাদের স্বীকার করতে হবে। ঘর-গৃহস্থলি কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নারীদের দায়িত্ব শিথিল করতে হবে। নারীদের শ্রমশক্তিতে রুপান্তরিত করার জন্য বাজেটে পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি সরকারি অফিসে ডে কেয়ার সেন্টারের মত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রতিটি ১০০ জন নারীর জন্য বাজারে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ মাত্র ৩৬ শতাংশ।  

নারীর ওপর ‘কোভিড-১৯’ মহামারির প্রভাব ভয়ংকর
বিশ্ব জুড়ে চলমান মহামারি ‘কোভিড-১৯’ মানুষের ওপর, সমাজ ব্যবস্থার ওপর, সামাজিক জীবন ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। নারী, পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তা থেকে নারীরাও রক্ষা পাচ্ছে না। বরং এর প্রভাব নারীদের ওপরেই বেশি পড়ছে। ‘কোভিড-১৯’ এর কারণে নারীদের কাজের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি চাপও বেড়েছে।

বিশেষ করে নারীর অবৈতনিক কাজের ক্ষেত্র আরো বেড়েছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোভিড-১৯ এর কারণে নারীর কাজ যেমন ঘর-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের সবার সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো দেখা, কাপড়-চোপড় পরিষ্কার, খাবারের বিষয় ও মেন্যু নির্ধারণ, পুষ্টির বিষয়টি মাথায় রাখা, সর্বোপরি রান্নার বিষয় থেকে শুরু করে সবকিছুই আগের থেকে আরো সতর্কভাবে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। স্বামী-সন্তান ছাড়াও পরিবারের সদস্যদের পোশাক পরিচ্ছন্ন করণ, সুরক্ষা, খাবার তৈরি ও পরিবেশন, বাড়ি-ঘর পরিস্কার, জীবানু মুক্তকরণ ইত্যাদি বাড়তি কাজ করতে হচ্ছে। লকডাউনের ক্ষেত্রেও নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাবও সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারীর ওপর।

সাস্প্রতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, তিনজন নারীর মধ্যে একজন লকডাউনের কারণে নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন। ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স এর কয়েকজন অর্থনীতিবিদের দ্বারা পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে নারীরাই পুরুষের চেয়ে বেশি মানসিক এবং শারিরীক সমস্যায় পড়ছেন। ৎ

গবেষণা থেকে আরো জানা গেছে, করোনা ভাইরাস মহামারী চলাকালীন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কিত মানুষের সংখ্যা সাত শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে, লকডাউনে এই পরিসংখ্যান ১১ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশে বেড়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, এই সময় পরিবার, বাচ্চা, গৃহস্থালির কাজ এবং অফিসের কাজ এই সবকিছু এক সঙ্গে সামলানোর কারণে নারীর ওপর মানসিক চাপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে।

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
উন্নয়নের রূপকার শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন আজ         সংগ্রাম ও সাহসের এক নাম শেখ হাসিনা         প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে টিকা ক্যাম্পেইন শুরু কাল         ডেঙ্গুতে আজও দুই মৃত্যু, শনাক্ত ২১৪         রেলের উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে ভারত: রেলমন্ত্রী         শেখ হাসিনার জন্মদিনে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি         ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার         শেখ হাসিনা এক জীবন্ত কিংবদন্তি: তথ্যমন্ত্রী         করোনাভাইরাসে ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে মৃত্যু-শনাক্ত         ইউপি নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিরীহ পারুলকে খুন         নিজ ঘরে মিলল নারী ব্যাংক কর্মকর্তার লাশ         চোর সন্দেহে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ         জেল থেকে মুক্তি পেল ফিলিস্তিনি নেতা খালিদা জারা         ভারতের উপকূল অতিক্রম করেছে ‘গুলাব’, নামল সংকেত         ১৪ নভেম্বর এসএসসি, ২ ডিসেম্বর এইচএসসি পরীক্ষা         জার্মানির নির্বাচনে হেরে গেল মারকেলের দল         রাজনীতিকে বিদায় জানালেন প্রণবকন্যা শর্মিষ্ঠা         নারী সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ গড়ে আইসল্যান্ডের ইতিহাস         আফগানিস্তানের বন্ধ হচ্ছে নারীদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র         মধ্যরাতে শিশু পুত্রকে গলা কেটে হত্যা করলেন মা         করোনা : সংক্রমণে যুক্তরাজ্য, প্রাণহানিতে শীর্ষে রাশিয়া