বুধবার, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮
২৮ জুলাই ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

এক নারীর পাঁচ স্বামী, অদ্ভুত এই প্রথা মানেন যারা

উইমেনআই২৪ ডেস্ক: রজ্জো ভার্মা হিমালয়ের কোল ঘেঁষে এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করেন। দুই পুত্র সন্তানের মা তিনি। আর দশজন নারীর চেয়ে একেবারেই ভিন্ন তার সংসার জীবন। গ্রামের শত শত প্রথা মেনেই পাঁচ স্বামী নিয়ে রজ্জোর সংসার। না, মহাভারতের দ্রৌপদির কথা নিজের মতো করে বলছি না। বাস্তবেই এই বিংশ শতাব্দীতে এসে ঘটছে এমনই ঘটনা। শুধু রজ্জো নয়, পুরো গ্রামেই এক নারীর স্বামী থাকে পাঁচ, ছয়, সাতজন করে। 
মহাভারতের দ্রৌপদীর চেয়ে এদের প্রেক্ষাপট আর ইতিহাস পুরোই ভিন্ন। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় উপজাতির মধ্যে এই প্রথা চালু রয়েছে। এখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ক্রমবর্ধমান ভূমি সংকট আর পুরুষের তুলনায় নারী জনসংখ্যার আনুপাতিক হ্রাস দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর এসব কারণেই তাদের দাম্পত্যজীবনে মহাভারতীয় সেই পঞ্চ-পাণ্ডব কাহিনির পাত্র-পাত্রীতে পরিণত করেছে। এই গ্রামে সহোদর সাত বা আট ভাই একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। বাস্তব ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রথা প্রাচীনযুগে কেরালার তিয়ান্স সম্প্রদায় এবং তিব্বতীয় উপজাতীয়দের মাঝে প্রচলিত ছিল।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতের উন্নততর রাজ্য পাঞ্জাবে এ ধরনের ঘটনা ঠিক যেন হজম করার মতো নয়। তবে একাধারে বংশপরম্পরায় ভাগাভাগির ফলে চাষযোগ্য জমির সংকট, দারিদ্র্যের কষাঘাত এবং এর সঙ্গে নারী জনসংখ্যার আনুপাতিক হ্রাস এখানকার জনগোষ্ঠীকে এই প্রথা মানতে বাধ্য করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পাঞ্জাবে নারী-পুরুষের আনুপাতিক হারের একটি হিসাব হচ্ছে ৭৯৩ জন নারীর বিপরীতে ১০০০ পুরুষ। এ অবস্থায় পুরুষান্তরে জমির পরিমাণ কমে যাওয়া রোধে গড়ে প্রতিটি পরিবারের অর্ধ-ডজন ভাই মিলে বিয়ে করছে একজন করে নারীকে। সরকারি সূত্রগুলোর দাবি অবশ্য ভিন্ন। তারা বলছে, বিয়ে করার মতো শিখ নারীর সংখ্যা বর্তমান পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার ফলেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এই ঐতিহ্য গত শতাব্দী ধরে চলে আসছে। তাদের যে জমি রয়েছে সেই জমি ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। পরবর্তীকালে তারা যখন বিয়ে করে, তখন সেই জমি তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রত্যেকের ভাইয়ের যেহেতু একটি মাত্র স্ত্রী থাকে, তাই আলাদা করে জমি প্রত্যেকের নামে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে এর ফল হিসেবে তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী বাল্যবিবাহের প্রকোপ এবং একই সঙ্গে অকাল মাতৃত্বের আশঙ্কাজনক হার।

তবে এখানকার নারীদের দাপটই আলাদা। রজ্জো ভার্মার পাঁচ স্বামীর নাম- সন্ত রাম, বাজ্জু, গোপাল, গুড্ডু, দীনেশ। পাঁচ স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে সুখেই সংসার করছেন রজ্জো। তাদের মধ্যে কোনো অশান্তি নেই বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একইভাবে সুখে সংসার করছেন সুনীতা দেবী নামে আরেক নারী। তার অবশ্য দুই স্বামী। তার দুই স্বামীও ভাই। একজনের নাম রঞ্জিত সিং, অন্যজনের নাম চান্দের প্রকাশ। গ্রামের পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন রজ্জো। প্রতি রাতে রজ্জো কার সঙ্গে থাকবে, সেটি সম্পূর্ণ তার সিদ্ধান্ত। এটাই সেখানকার রীতিনীতি।

গ্রামের একজন বাসিন্দা সুনীতার ভাষায় তিনি খুবই ভাগ্যবতী। কারণ তিনি দুজন স্বামীর স্ত্রী। একজন তাকে রান্নাতে সাহায্য করে এবং অন্যজন বাচ্চা মানুষ করতে। এমনইভাবে দুই ভাইকে বিয়ে করেছিলেন বুদ্ধি দেবীও। তার বয়স এখন প্রায় ৮০ বছর। তার এক স্বামী মারা গেছে। অন্যজন এখনও বেঁচে আছেন।

তবে এ পরিস্থিতি ঠেক দিতে আজকাল ওইসব এলাকার অনেকেই পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহার, উত্তর প্রদেশ থেকে বিয়ে করে ঘরে বউ তুললেও গ্রামের ধর্মগুরু ও সমাজপতিরা তাতে বাধ সাধছেন। নিজেদের সমাজ-সংস্কৃতির বাইরের মেয়েদের স্ত্রী করে আনার ফলে তাদের গর্ভে যেসব সন্তানের জন্ম হবে তারা সত্যিকারের পাঞ্জাবিদের চেয়ে হীনতর হবে বলে তারা মনে করেন।

অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে একজনের বিয়ে করা বউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর অন্য ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং ন্যাশনাল কমিশন ফর ওমেনের নজরদারিতেও এসেছে বিষয়টি। তারাও মনে করছে এসব অঞ্চলের নারীরা মোটেই স্বেচ্ছায় মনোদৈহিক এ দুর্ভোগ মেনে নিচ্ছেন না, প্রবল সামাজিক চাপ আর পারিবারিক দারিদ্র্যের অলঙ্ঘনীয় বাধ্যবাধকতাই তাদের বিনাবাক্যে এই প্রথা মেনে নিতে বাধ্য করছে।

এর বিপরীতে সরকারি নথিপত্রে ‘বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া’ পুরুষের সংখ্যাটা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পাঞ্জাবের গ্রামীণ জনপদ বাথিন্দা, মনসা মুকটসার, সাংগরুর, ফরিদকোটসহ আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি রীতিমতো আশঙ্কাজনক। তবে সরকারি এবং এক অর্থে সামাজিক হিসেবে পুরুষদের ওই বিশাল সংখ্যা অবিবাহিত থাকলেও সোজা বাংলায় যাকে বলে নারীসঙ্গ বা দাম্পত্য জীবনের স্বাদ থেকে এরা মোটেই বঞ্চিত নয়। খাতা-কলমে অবিবাহিত এসব পুরুষ প্রত্যেকে নিজ পরিবারে কোনও এক ভাইয়ের স্ত্রীকে ভাগাভাগি করছেন।


পাঞ্জাবের লুধিয়ানা ও জলন্দরের পল্লী অঞ্চলে চাষীদের মধ্যে দুটি শ্রেণী রয়েছে। একটি শ্রেণী হচ্ছে বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক। তাদের রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক অফিসসহ বিশাল সব ফার্মহাউস বা কৃষিখামার, চলাচলের জন্য আছে ইম্পোর্টেড বিএমডব্লিউ, লেক্সাসসহ দামি গাড়ি। তাদের লাইফস্টাইলে পাঞ্জাবের সনাতনি ঐতিহ্যের ওপরে রয়েছে পুরু ওয়স্টার্ন সংস্কৃতির প্রলেপ। ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতি-রেওয়াজ আর বংশীয় বা গোত্রগত কৌলীণ্য বজায় রাখার স্বার্থে দরকারি আচার-অনুষ্ঠান আর জীবনাচারে তাদের মোটেই কোনো জটিলতায় পড়তে হয় না। আর অন্য শ্রেণীটি হচ্ছে আমাদের গ্রামাঞ্চলের মঙ্গাতাড়িত কৃষকদের মতো। এদের কারো কারো অল্প পরিমাণে জমি থাকলেও অধিকাংশই ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিক বা দিনমজুর প্রকৃতির লোক। এরা তাই থেকে যাওয়া যৎসামান্য ভূ-সম্পত্তিটুকুর খ- খ- হওয়া ঠেকাতে পাণ্ডব-দ্রৌপদী তত্ত্বের অনুশীলনে বাধ্য হয়ে পড়েছেন। আর যাদের সামান্য জমিটুকুও নেই তাদের জন্য বিষয়টা আরও বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।

চলমান এই প্রক্রিয়ার গ্রামের মানুষ একদিকে যেমন অসুবিধা পোহাচ্ছে তেমনি সুবিধাও আছে অনেক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে পরিবারে প্রথম যে ভাইটা বিয়ে করে (সাধারণত বড় ভাই) তার স্ত্রীই স্বামীর অন্য ভাইদের দৈনন্দিন যাবতীয় প্রয়োজনের দেখভাল করেন। তাদের খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়, গরু-লাঙ্গল দেখা থেকে শুরু করে পালাক্রমে তাদের শয্যাসঙ্গীও হতে হয় তাকেই। কিছু কিছু ঘটনায় দেখা গেছে সর্বোচ্চ আট সহোদরের ‘স্ত্রী’ হতে হচ্ছে একজন মাত্র নারীকে।

বলিউডে এই কাহিনি নিয়ে একটি সিনেমাও তৈরি হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে গ্রামের মেয়ে সন্তানের এতোই অভাব যে একটি মেয়ে পেলে তাকে বিয়ে করার জন্য একেকটি পরিবারের লড়াই পর্যন্ত করতে হয়। তবে সেখানে অবশ্য ডিরেক্টর গল্প সাজিয়েছেন একটু অন্যভাবে। কন্যা সন্তান হলেই বাবা মায়ের মুখ কালো হয়ে যায়। সমাজের প্রচলিত ধারা ছেলে ছাড়া বংশের বাতি জ্বলবে না তাই কন্যা সন্তান হলেই মেরে ফেলা হতো। সেখানে এক লোক তার মেয়েকে ঘরের চারদেয়ালের মাঝে সবার চোখের আড়ালে বড় করে তোলে। তার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। তারপরও ছেলেদের পোশাক পরে বাইরে গিয়ে একদিন ধরা পরে যায়। এরপর পাঁচ ভাইয়ের বউ এবং শ্বশুরের যৌন লালসার স্বীকার। কন্যা সন্তান জন্ম দেয়া ছাড়াও আরো কিছু সুবিধা অসুবিধা নিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল কমিশন ফর ওমেনের চেয়ারম্যান ড. গিরিজা ব্যাস বলেন, ‘এ ধরনের একজন নারীর কয়েক গণ্ডা বাচ্চা-কাচ্চা থাকে, যাদের কারোই পিতৃ-পরিচয় নির্ধারিত নয়। ’ অর্থাৎ স্ত্রীটির আইনসিদ্ধ স্বামী বা তার কোন ভাইটি ওই সন্তানের প্রকৃত জন্মদাতা তা অজ্ঞাত থেকে যায়। এর আরেক অর্থ প্রতিটি সন্তানেরই কমন বাবা হচ্ছেন পাঁচ-ছয়-সাত বা আটজন সহোদর ভাই।


আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে একজন নারীর একসঙ্গে জনা-আষ্টেক সহোদরের স্ত্রী হওয়ার এই অমানবিক ও অচিন্ত্যনীয় চল থামাতে আইন তেমন কিছু একটা করতেও পারছে না। কারণ ওইসব ‘বিয়ে’ কখনোই প্রচলিত ধর্মীয় বা সামাজিক বিধি-বিধান মেনে হয় না। তাই এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণপত্র বা সাক্ষী-সাবুদ একেবারেই পাওয়া যায় না। আর তাই হিন্দু বিবাহ আইন বা ভারতীয় দণ্ডবিধির কোনো ধারায়ই একে শাস্তিযোগ্য বা অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। এমনকি কোনো নারী এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আইনের দ্বারস্থ হয়েছে এমন ঘটনাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অপরদিকে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এসব গ্রামে সমাজপতি আর পরিবারগুলোর মাঝে রয়েছে মজবুত এক সমঝোতা।


মা/১৭

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
‘শুধু একটু মুখ ফুটে বলতে হবে’         ‘পরীক্ষা করান, টিকা নিন’         রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিরুদ্ধে ফরাসি আইনজীবীর লিগ্যাল নোটিশ         আইভীর বাড়িতে শামীম ওসমান         সালিশি বৈঠকে চেয়ারম্যানের ওপর অতর্কিত হামলা         গ্রহবধূ এবং স্কুলছাত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ         ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৫৮ জনের মৃত্যু         'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'         ঘর পরিষ্কার করুন নিয়ম মেনে         জিন্স পরায় পিটুনি খেয়ে প্রাণ হারালেন কিশোরী         পাহাড় ধসে ৬ রোহিঙ্গার প্রাণহানি         ‘ভালো কাজে পুরস্কার, খারাপ কাজে শাস্তি’         বজ্রপাতে বাবা-ছেলের মৃত্যু         সব মামলায় জামিনের মেয়াদ বাড়ল         এবার বাংলা টিভি চ্যানেলে সানি লিওন’র কোমড় দোলা         মহারাষ্ট্রে বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১৯২         কূটনীতিক রেজিনা আহমেদের ক্যারিয়ারের গল্প         ‘লিবিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে ৫৭ অভিবাসীর মৃত্যু’         ঋতাভরীর বিয়ে আগামী বছর, বন্ধু হবেন বর