বুধবার, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮
২৮ জুলাই ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

প্রবাসে নারী শ্রমিকের এ কেমন জীবন

নাছিমা মুন্নী: যে চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছে রহিমার (ছদ্মনাম), সেই চোখে একসময় ছিল আত্মবিশ্বাস। একটা সময় এলাকার সমিতি রহিমারই নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। এসব কথা বলতে বলতে রহিমা একঝটকায় চোখের পানি মুছে ফেলে বলেন, ‘আবার সমিতিতে যোগ দিব। হাঁস-মুরগি, গরু ছাগল লালন পালন করবো। সমিতির কয়েকজন মিলে কোনো একটা ব্যবসা শুরু করবো। তবুও আর বিদেশ যাব না। কোনো মেয়েকে যেতেও দিবে না।’

লক্ষ্মীপুর জেলার সর্দারবাড়ি বাসিন্দা রহিমা বেগম বিদেশ গিয়ে তিন মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন। অনেক টাকা খরচ করে চাষাবাদের যেটুকু জমি ছিল তা বিক্রি করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন রহিমা। আদম ব্যাপারি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আদম ব্যাপারির মেয়েও সেখানে আছেন এমন ভরসায় সে দেশেই যেতে চায় রহিমা। জানাশোনা মানুষ যেহেতু সেখানে আছে, বিপদ আপদে তাকে কাছে পাওয়া যাবে। সেই ভরসায় রহিমা পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশ। বেশি টাকা কামাই করে সংসারে স্বচ্ছলতা আনবেন। অভাব থাকবে না। সেখানে বাসাবাড়িতে কাজকর্ম করবেন। এ আর এমন কী! তাই শহরের বাসাবাড়ির কাজও শিখে নিয়েছিলেন তিনি।

সৌদি আরবে গিয়ে তিনজনের একটি পরিবারের বাসায় রহিমা কাজে যোগ দেন। ওই পরিবারে ছিলেন স্বামী স্ত্রী ও তাদের একমাত্র (ছেলে) সন্তান। সৌদি আরবের ভাষা জানা না থাকলেও তাদের বাসার কাজগুলো কীভাবে করতে হবে বুঝতে পেরেছিলেন রহিমা। যদিও বাড়ির সবার জন্য খুব মন খারাপ হচ্ছিল। সেখানে একদিন একরাত ভালোভাবেই কেটেছিল রহিমার। তাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল মালিকের বাসার পাশেই একতলা দুই রুমের একটা বাসায়।

সারাদিনের কাজ শেষে দ্বিতীয় দিন রহিমা রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ধড়মড় করে উঠে দরজা খুলতেই দেখে পাঁচজন পুরুষ আর মালিকের বউ দাঁড়িয়ে। পাঁচজন পুরুষ একে একে রহিমার রুমে ঢুকে যায়। আর মালিকের বউ রহিমাকে ইশারায় বোঝালেন, এদের সন্তুষ্ট করলে বেতন বাড়িয়ে দিবে। রহিমা এদের ভাষা না বুঝলেও তার রুমে এই পুরুষদের আগমন কেন, তা বুঝতে পেরেছিলেন। আর সে মুহূর্তে শুধু রহিমার মনে হয়েছিল, আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা পেতে হবে যে কোনোভাবেই। রহিমা এক ঝটকায় রুম থেকে বের হয়ে চিৎকার শুরু করে দেন। তৎক্ষণাৎ পুরো এলাকার সব বাড়ি থেকে লোকজন বের হয়ে আসে। ভাষা না জানার কারণে রহিমা ইশারা দিয়ে সবাইকে বোঝালেন তার সঙ্গে কী ঘটতে যাচ্ছিল।

এলাকাবাসী পুলিশ ডেকে তার মালিককে ধরিয়ে দেয়। পরদিন থেকে রহিমাকে খাবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটানা পাঁচ দিন খাবার খেতে না পেরে রহিমা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্ষুধা মেটাতে তিনি ডাস্টবিন থেকে রুটি কুড়িয়ে খান। সাতদিন পর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়ে এসে সেখান থেকে রহিমাকে নিয়ে যায়ন। তিনি রহিমাকে বলেন, ‘তুমি একাজে রাজী হয়ে যাও। অনেক টাকা খরচ করে এদেশে এসেছো। টাকাটা তুলতে হবে। আর তুমি যদি ওদের কথায় রাজি না হও, তারা তোমাকে ডিসকোয়ালিফাইড দেখিয়ে দেশে ফেরৎ পাঠাবে।’

রহিমা সৌদি যাওয়ার খরচ ফেরৎ চাইলে মালিক তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এভাবে তিন মাস পর রহিমাকে কাজে অক্ষম দেখিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

রহিমা আদম ব্যাপারির নামে মামলা করার জন্য একজন উকিলের শরনাপন্ন হন। উকিলের সঙ্গে কথা বলার পর রহিমা বুঝতে পেরেছিলেন কাবিননামায় তার স্বামীর নাম ভুয়া ছিল। রহিমার বিয়ের সময় কাবিন করা হয়নি। তার বিদেশ যাওয়ার কথা বার্তা যখন চলছিল তখন আদম ব্যাপারি রহিমার কাবিন তৈরি করে নিয়ে আসে। রহিমার বুঝতে আর বাকী থাকে না যে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই কাবিননামায় তার স্বামীর নামে অন্য একটি নাম লিখেছিলেন আদম ব্যাপারি, যাতে রহিমার মতো নারীরা প্রতারিত হলেও আইনের আশ্রয় নিতে না পারে। কথাগুলো বলতে বলতে চোখে মুছতে থাকে রহিমা।

পরিবারের ভাগ্য ফেরানোর আশায় হাজারো নারী শ্রমিক প্রতিবছর বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু সেখানে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। যৌন সহিংসতা, বেতন না দেওয়া, খেতে না দেওয়া, কাজে ভুল হলে মারধর, অতিরিক্ত কাজ করানো, মিথ্যা মামলা দেওয়া, কোনো কাজে অপারগতা প্রকাশ করলে কাজে অক্ষম দেখিয়ে দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়। প্রতিনিয়ত প্রবাসে এমন নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেক নারী ।

আবার যারা প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন, তাদের নিয়ে সমাজে অনেকেই উপহাস করে। বিদ্রুপ করে। যারা অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসে, তাদের সম্পর্কেও সমাজে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। এ ধরনের ঘটনা একজন নারীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়।

নারীদের যে কোনো পেশায় কাজ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিপদের আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। তারা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থায় থাকে বলে।

ভাগ্যান্বেষণে দূর দেশে কাজ করতে গিয়ে পাচার কিংবা যৌন নির্যাতনের বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি কেবল নারীদেরই থাকে। নারী শ্রমিকরা অনেক সময় বিদেশে যাওয়ার আগে সে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার না করেই প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অপরিকল্পিতভাবে বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে তারা নানা সমস্যা সম্মুখীন ও প্রতারণার শিকার হন।

যতই সময় যাচ্ছে নারীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সম্ভাবনা যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। গৃহশ্রমিক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত নারীকর্মীদের মধ্যে অনেকেই নিয়োগকর্তার অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

বিদেশে  কমবেশি প্রায় সব পেশায় নারী শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার হন। তবে যারা গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তারা বেশি মাত্রায় শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হন। গৃহকর্মে অন্তরীণ পরিবেশ থাকার কারণে নির্যাতনের অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয় না। বেশিরভাগ সময়ে নারী শ্রমিকরা সব অন্যায় সহ্য করতে বাধ্য হয়। আর যখন নির্যাতন অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায় তা থেকে বাঁচতে কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেন। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসে। কেউ কেউ ভয়াবহ নির্যাতনের কারণে মৃত্যু মুখেও পতিত হয়।

কুয়েত গিয়েছিলো লক্ষ্মীপুর জেলার  কুলসুম ( ছদ্মনাম)। কুলসুমের মুখের মধ্যে কালো ছোপ ছোপ দাগ আর গালের দুই জায়গায় গর্ত হয়ে আছে। শরীরের যতটুকু দৃশ্যমান সব জায়গায় কালো ছোপ ছোপ কামড়ের দাগ। প্রতিদিনই সাত আটজন পুরুষ তার সঙ্গে যৌন সহিংসতা চালাতো আর কামড়ে উল্লাস করতো। কুলসুমের শরীর রক্তাক্ত হয়ে যেত তাদের যৌন সহিংসতায়। কুলসুম যন্ত্রণায় শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করতেন কিন্তু কারো কানে সে চিৎকার কোনোদিন পৌঁছায়নি। কুলসুমের আর্তনাদ দেয়াল থেকে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতো। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন কুলসুম। কিন্তু তারও উপায় ছিল না। সার্বক্ষণিক কারো না কারো পাহারায় থাকতো সে। কখনো মনে হতো শুধু একবার ছাদে উঠতে পারলেই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু ছাদে ওঠারও সুযোগ হয়নি কোনোদিন। একসময় তার মনে হতো আত্মহত্যাই একমাত্র এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে। এভাবেই ছয় মাস পার হয়ে যায় কুলসুমের।

কুলসুম আশা হারায় না। পাসপোর্ট মালিকের কাছে। পাসপোর্ট ছাড়া পালানোরও উপায় নেই। একদিন পাশবিক যৌন নির্যাতনে কুলসুমের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কুলসুমের এ পরিস্থিতি ততোক্ষণে জানাজানি হয়ে যায় হাসপাতালে। কুলসুমের সঙ্গে নানা জিজ্ঞাসাবাদ চলে। পরে কুলসুমকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শরীরের ক্ষতচিহ্ন বলে দেয় কী পরিমাণ অত্যাচার আর নিপীড়ন তার শরীরের উপর দিয়ে গিয়েছিল।

তাইতো দেখা যায় অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরেন। শুধু যে মরদেহ হয়েই ফেরে তাই নয়, অনেকেই ফেরেন নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে। পরে তারা পরিবার ও সমাজে সবসময় হেয় প্রতিপন্ন হন এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার তাদেরকে গ্রহণ করতে চায় না।

অভিবাসন মানব সমাজের ইতিহাসে একটি প্রাচীন প্রক্রিয়া। বহু যুগ ধরেই মানুষ বিভিন্ন কারণে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শ্রম অভিবাসন। পৃথিবীর অভিবাসী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এশিয়া মহাদেশের।

১৯৭৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রম অভিবাসনের সূচনা ঘটে। অন্যদিকে ১৯৮০ সাল থেকে পুরুষদের পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রম বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ শুরু হলেও তাদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। প্রথমদিকে নারীরা মূলত: ডাক্তার, নার্স এবং শিক্ষকতা পেশায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসী নারীদের এই হার এখন ক্রমবর্ধমান।

গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিকদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হলেও নির্যাতনের শিকার তারাই বেশি হয়। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। অথচ অভিবাসী নারী শ্রমিকরা পুরুষ অভিবাসী শ্রমিকদের চাইতে কম উপার্জন করলেও তারা তাদের আয়ের ৯০ শতাংশ টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের নারীদের রয়েছে অনেক বড় ভূমিকা।

করোনাকালে বিদেশে কাজ করা গৃহশ্রমিকরাও অনেকে চাকুরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু বিদেশে কাজ করা বাংলাদেশিদের পক্ষে কথা বলতে হলে সরকারকে আগে নিজ দেশে কাজ করা গৃহশ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়ার দায় রয়েছে। কিন্তু গৃহশ্রমিকদের পেশাগত স্বার্থ দেখার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যে সনদ রয়েছে তার সুরক্ষা বাংলাদেশের শ্রমিকরা পায় না বললেই চলে। কারণ বাংলাদেশ তাতে স্বাক্ষরই করেনি।

নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রবাসে নারীদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভিকটিমকে দেশে ফেরৎ আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। নারী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও অর্থসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ধীরে ধীরে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে নারীদের বহুমুখি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই নারী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ হবে।

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
‘শুধু একটু মুখ ফুটে বলতে হবে’         ‘পরীক্ষা করান, টিকা নিন’         রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিরুদ্ধে ফরাসি আইনজীবীর লিগ্যাল নোটিশ         আইভীর বাড়িতে শামীম ওসমান         সালিশি বৈঠকে চেয়ারম্যানের ওপর অতর্কিত হামলা         গ্রহবধূ এবং স্কুলছাত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ         ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৫৮ জনের মৃত্যু         'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'         ঘর পরিষ্কার করুন নিয়ম মেনে         জিন্স পরায় পিটুনি খেয়ে প্রাণ হারালেন কিশোরী         পাহাড় ধসে ৬ রোহিঙ্গার প্রাণহানি         ‘ভালো কাজে পুরস্কার, খারাপ কাজে শাস্তি’         বজ্রপাতে বাবা-ছেলের মৃত্যু         সব মামলায় জামিনের মেয়াদ বাড়ল         এবার বাংলা টিভি চ্যানেলে সানি লিওন’র কোমড় দোলা         মহারাষ্ট্রে বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১৯২         কূটনীতিক রেজিনা আহমেদের ক্যারিয়ারের গল্প         ‘লিবিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে ৫৭ অভিবাসীর মৃত্যু’         ঋতাভরীর বিয়ে আগামী বছর, বন্ধু হবেন বর