সোমবার, ৭ আষাঢ় ১৪২৮
২১ জুন ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

স্বর্গবাসী ঢেঁকি

রওনক খান: ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে। একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ। এবং এর সত্যতা আমরা কম বেশি সবাই সময়ে অসময়ে উপলব্ধিও করেছি।

এই যেমন আমার এক নিকট আত্মীয়, ভীষণ ভালো রান্না করতেন। তিনি কোন উৎসব বাড়িতে গেলে সে বাড়ির চিন্তিত মানুষগুলো সোজা তাকে রান্না ঘরে টেনে নিয়ে যেত। এটা একটু চেখে দেখতো,  ঠিক হল কীনা,  ওটাতে কী আরো একটু টকদই বেশি দিতে হত। এখনও সময় আছে দেওয়া যাবেতো তাইনা?  বলে সেই রন্ধন পটিয়সী আত্মীয়ার মতামতের অপেক্ষায় অধীর উত্তেজনা। বেচারা সু রাধুনী হয়ে কতটা বিপাকেই না ছিলেন! এসেছিলেন সেজেগুজে দাওয়াত খেতে, সেখানেও রান্নাঘর ঢুকে তাকে ঘেমে নেয়ে একসা হতে হতো।

ঢেঁকি নিয়ে প্রবাদের কি শেষ আছে। মাঝেমধ্যেই আমাকেও তো শুনতে হয় তোমার মত বুদ্ধির ঢেঁকিকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা। তা ঠিক, এত দিনে বুঝে গেছি, নিজের বুদ্ধির দৌঁড় বিবেচনায় ঢেঁকিতে আর আমাতে তেমন তফাৎ নেই। আচ্ছা সত্যিই কি ঢেঁকি নামক এক আদি সংস্কৃতির বুদ্ধি এত কম ছিল?

তা কী করে হয়!  ফসলের সংগে যেমন জড়িয়ে রয়েছে সভ্যতার ইতিহাস, ঠিক তেমনিভাবে সেই সভ্যতার দাবিদার ঢেঁকি নামক এই সাংসারিক অনুষঙ্গটি। সেকালে ঢেঁকির সংগে নারীর ছিল এক নিবিড়  যোগ। এই অযান্ত্রিক আবশ্যিকটি পরিচালিত হতো নারীদের দ্বারাই। সেখানে পুরুষের ভূমিকা বলতে এটির সৃষ্টি কর্মে সীমাবদ্ধ ছিল মাত্র । এদেশে এমন একদিন তো ছিল, যখন এই বাবলা বা গাব বা বেল গাছের কাঠ থেকে তৈরি বুদ্ধিহীন যন্ত্রটি বহু অনাথ সম্বলহীন নারীর জীবিকার দায়িত্ব পালন করত। অবলম্বনহীন রমনী কূল গৃহস্থ বাড়ি গিয়ে তাদের ঢেঁকিশালে দিনের অনেকটা সময় কঠোর শ্রমে ঘামে ধান ভেঙে দিত। বিনিময় হিসেবে প্রাপ্তিতে চলত তাদের দিনগুজরান। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির কিছুটা ভাগবাটোয়ারা হতো এই জড়বস্তুটির মাধ্যমে।

কোন অবস্থা সম্পন্ন ঘরের গৃহবধূরা এই কাজটি করতেন না। তাদের জন্য ঢেঁকি সামলানো বিষয়টি খানিকটা মর্যদাহানিকর বলেই বিবেচিত হত। এই প্রসংগে বহুবছর আগে আমার পূর্বপুরুষে  ঘটে যাওয়া একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমার দাদাজান গেছেন তার বড় কন্যাটির জন্য সম্বন্ধ পাকাপাকি করতে একটি অবস্থা সম্পন্ন পরিবারে। সংগে অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে আমার বারো তেরো বছর বয়সের ছোটচাচাও ছিলেন। দাদা তার এই বালক বয়সী ছেলেকে  কায়দা করে ভিতর বাড়িতে গিয়ে দেখে আসতে বললেন সেখানে কোন ঢেঁকি শাল আছে কীনা। বাড়ির অভ্যন্তর আঙ্গিনায় ঢেঁকিশালের উপস্থিতির অর্থ হলো সে বাড়ির মেয়ে বউরা সেটি ব্যবহার করে। সম্পন্ন পরিবারগুলোতে ঢেঁকিশালটি থাকতো মূল বাড়ি থেকে দূরে সেই  বাড়ির একটি পৃথক আঙ্গিনায়। তেমন পরিস্থিতি হলে দাদাজান তার আদরের সুপুত্রীকে সেখানে পাত্রস্থ করবেন না।  ছোট চাচা এহেন একটি মহান দায়িত্ব পেয়ে এক দৌঁড়ে ভিতর বাড়িতে একটি চক্কর দিয়ে এসেই একঘর লোকের সামনে তার বালক সুলভ চাপল্যে  ঘোষণা করলেন, "বাবা, এদের ভিতর বাড়িতে ঢেঁকিশাল আছে"। যথারীতি সেখানে পাত্রপক্ষের অভিভাবকেরাও  উপস্থিত ছিলেন। "হে ধরণী দ্বিধা হও "। ঠিক সেই মুহূর্তে দাদার অবস্থাটা যে ঠিক এমনটাই হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।

এই ঢেঁকি থেকে চাল, ডাল ভাঙা, আটা কোটার 
কাজটি বেশ শ্রম সাপেক্ষ। শুধু তাই নয় এতে দুর্ঘটনা ঘটার শংকাও ছিল। যে পদ্ধতিতে ধান ভাঙা বা চাল কোটা হতো তাতে একজনকে ঢেঁকির মুখে চালগুলো হাত দিয়ে এগিয়ে দিতে হত। আচমকা তার হাতেই ঢেঁকির পাড় পড়ে হাত থেতলে গেছে এমন দুর্ঘটনা হরহামেশাই ঘটতে দেখা যেত। তবে সে যুগের দুঃস্থ  রমনী কূলের কাছে ক্ষুধার জ্বালার তুলনায় সে যন্ত্রণা  ছিল নিতান্ত তুচ্ছ।

এই ঢেঁকিশালকে ঘিরে প্রাচীন বাংলায় সৃষ্ট  সংস্কৃতি  আবহমান কাল যাবৎ প্রবাহিত হয়ে আসছে । আধুনিক শিল্পায়নের ফলে সেই ধারা হয়তো কিছুটা স্তিমিত, তবু তার একটা রেশ সংস্কৃতির আধুনিক ধারায় এখনও বহমান। একটি নিরেট কাঠের নিতান্ত অসুন্দর  অথচ নিত্যব্যবহার্য যন্ত্রটিকে ঘিরে রচিত হয়েছে কত গ্রাম্য গীত। সেকালে রমনীকূল ঢেঁকিতে পাড়  দিতে দিতেই গেয়ে উঠতেন, ঢেঁকির আগাত পাড় দিয়া রে, ধাই ধাপুর, ধাই ধাপুর ধান ভানি রে। (উত্তর বঙ্গ) 
অথবা, "ও ধান ভানি রে, ঢেঁকিত পাড় দিয়া। 
ঢেকি নাচে, আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া "।
 
এই যন্ত্রের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে যে রমনীটি একমনে ছন্দময় ভঙ্গিতে দুহাতে মাথার উপরের বাঁশের আড়টি শক্তভাবে ধরে একপা দিয়ে ঢেঁকিতে পাড় দিতেন,  তাতে করে সে সময় তার দেহবিভঙ্গে নানান অপূর্ব নাচের মুদ্রা ফুটে উঠত।  আর যদি সেই নারী সুন্দর দেহসৌষ্ঠবের অধিকারিণী হন তবে তো কথাই নেই। ঢেঁকিশাল তখন পরিণত হত একটি সুরঙ্গম নৃত্যমঞ্চে।

সেই  সুন্দর দেহভঙ্গিমার দৃশ্যায়নে  অভাগা, অনাথ, দুঃস্থ  রমনীরা কখনও কখনও গৃহস্থবাড়ির নারী লোলুপ পুরুষ সদস্যদের লালসার শিকারও হতেন। এই নিয়ে রয়েছে অন্তহীন গল্পগাছাও।

মোটের উপর ব্যপারটা দাঁড়ালো, ঢেঁকিকে কখনও কখনও আমড়া কাঠের ঢেঁকি, বা বুদ্ধির ঢেঁকি বা ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে এইসব ব্যাঙ্গাত্বক প্রবাদের মোড়কে জড়িয়ে  ঠাট্টা তামাশার বিষয় বানানোর প্রচেষ্টা আবহমান কাল হতে চলে এলেও এর গুরুত্ব কিছু কম ছিলনা। ছিলনা বলছি,  তার কারণ, ইদানীং ঢেঁকি প্রকৃত অর্থেই স্বর্গবাসী হয়েছে। বাংলার এই গ্রামীন ঐতিহ্যটি এখন ইতিহাসের পাতায় পাতায় ধান ভানে। বাস্তবে তার দেখা মেলা ভার। সেই শূন্য স্থান পূর্ণ করতে এসেছে চালকল, হাস্কিং মেশিন আরো কতশত যন্ত্র। সেই  অযান্ত্রিক প্রচলিত প্রবাদের  আমড়া কাঠের ঢেঁকিকে স্বর্গে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে তারা এখন ডিজেল, মবিল নাকে গুঁজে ধান ভাঙ্গার কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করে চলেছে।

আর সেই সব দুঃস্থ, শ্রমজীবী রমনীকূল? তারা তাদের নিশ্চিত পেশাটি  হারিয়ে দুর্দশাময় জীবনকাল কাটিয়ে গেছেন। সেও বহুকাল হতে চলল। আজকাল গ্রামের বৌ ঝিরা ঢেঁকি নামের যন্ত্রটির সাথে হয়তো তেমন করে পরিচিতও নয়।

দিনে দিনে তাই প্রাচীন বাংলার গ্রামীণ জনপদের গৃহস্থ বাড়ির উঠোনের এককোণে একচালা ঢেঁকি ঘরটি এখন কেবলমাত্র  শুভংকরের ফাঁকি।

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
ধানমন্ত্রীকে কটূক্তি: টাঙ্গাইল পৌর প্যানেল মেয়রের পদ স্থগিত         বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হলেন শেখ ইউসুফ হারুন         স্মার্ট ফোন কিনে না দেওয়ায় তরুণের আত্মহত্যা         যেভাবে ঘুমালে ত্বকের সৌন্দর্য্য বাড়ে!         ভোটগ্রহণ ভালো হয়েছে: ইসি সচিব         সাংবাদিক নির্যাতন দিবসে অবিলম্বে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের দাবি         হাতকড়ায় বাঁধা দম্পত্তির ভালোবাসার গল্প         ‘তার কাছে বেগম জিয়ার চেয়েও চিত্রনায়িকা গুরুত্বপূর্ণ’         দেশের আরো ৭ জেলায় লকডাউন         ‘নারী কাউন্সিলরের ক্ষেত্রে ‘সংরক্ষিত’ কথাটি বাদ দিতে হবে’         বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির রহস্য ফাঁস         দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ         শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তদের জামিন স্থগিতই থাকছে         পুকুরে ডুবে কিশোরের প্রাণহানি         পরীমণির বিরুদ্ধে আবারো ভাঙচুরের অভিযোগ         ভালুকায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় প্রাণহানি ৩         মালয়েশিয়ায় আটক ১০২ বাংলাদেশি         চরফ্যাশনে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি ১         যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ শিশুসহ প্রাণহানি ১০         উন্নত দেশে অভিবাসন শুধুই কী প্রশান্তির!         যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকো সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো