বুধবার, ২ আষাঢ় ১৪২৮
১৬ জুন ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

বিবাহ বিচ্ছেদে এগিয়ে নারীরা

ফারজানা ফাতেহা: বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ। কারোনাকালীন সময়ে বিবাহ বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নারীরা। প্রতি ১০০ জনে ৭০ জন নারী এবং ৩০ জন পুরুষ বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছে। তবে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, এটা সিটি কর্পোরেশন এর তথ্য। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুরো দেশকে বিবেচনা করলে হবে না।

নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ বৃদ্ধির অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা ও স্বনির্ভরতাকে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

শিক্ষিত মেয়েরাই ডিভোর্সের শীর্ষে এমন শিরোনামে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মন্তব্যের ঘরে অসংখ্য অযাচিত ও অশোভন মন্তব্য দেখা যায়। মেয়েদের স্বনির্ভরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। যেহেতু নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদে এগিয়ে আছে তাই প্রশ্ন উঠছে এটা কি সচেতনতার ফলাফল না পশ্চিমা দেশগুলোর কথিত আধুনিকতার প্রভাব?

শিক্ষিত মেয়েদের ডিভোর্সের হার বেশি এর কারণ এটা নয় যে, তারা শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী। মেয়েরা শিক্ষিত হলে, নিজের আয় থাকলে সেই মেয়েকে নির্যাতন করা কঠিন। নির্যাতন করলেও সেই মেয়ে মুখ বুজে সহ্য করবে এটা ভাবা ভুল। নারীদের শিক্ষার হার যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে সচেতনতাও। মেয়েদের মধ্যে স্বনির্ভরতা বাড়ছে তাই তারা অন্যায় আবদার আর অত্যাচার সহ্য করছে না।

যে মেয়েটি পড়াশোনা করেনি এবং নিজের আয়ের উৎস নেই সেই মেয়েটি সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে কারণ তার যাওয়ার মতো কোন যায়গা থাকে না। সামাজিক লজ্জার ভয়ে এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক নারী সবকিছু সহ্য করলেও স্বনির্ভরশীল মেয়েরা এভাবে জীবন চালাতে চাচ্ছে না।

কারণ
ঠিক কী কী কারণে তালাক বাড়ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। তবে পরিসংখ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার মতে নারীদের তালাকের ক্ষেত্রে যৌতুক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বামীর পরকীয়া ও দায়িত্বহীনতা, নারীর পরকীয়া,  অবাধ মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার অভাব অন্যতম কারণ ।

সহিংসতা ও যৌতুক
বাংলাদেশের মতো দেশে যৌতুকের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ নতুন কিছু নয়। পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুকের কারণে প্রতি বছর অনেক নারীকে নির্যাতন এমনকি মেরে ফেলা হচ্ছে। তবে যৌতুকের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা নিম্নবিত্ত মেয়েদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারে মেয়েদের ওপর শারীরিক নির্যাতন না হলেও (অনেক যায়গায় তাও হয়) মানসিকভাবে একটি নারীকে প্রতিনিয়ত হেনস্তা হতে হয়।

স্বামীর দায়িত্বহীন আচরণ
তবে শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী মেয়েরা বিবাহ বিচ্ছেদে এগিয়ে থাকার কারণ মনোবিজ্ঞানীরা অন্যভাবে দেখছেন। তাদের মতে, শিক্ষিত নারীদের বেশিরভাগের বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ তাদের স্বামীর দায়িত্বহীনতা এবং হীনমন্যতায় ভোগা ও সন্দেহ প্রবণতা।
যেখানে এখন নারীরা ঘরে এবং কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে সেখানে দেখা যাচ্ছে পুরুষরা বাইরে ঠিক মতো কাজ করলেও ঘরে নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। অনেক পুরুষ কর্মক্ষেত্রেও সক্রিয় না, ঘরের কোন কাজে দায়িত্ব নিচ্ছে না এবং পরিবারকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেকে পর্যাপ্ত আয় করলেও সংসারের ঠিকমতো অর্থ পরিচালনা করছে না। অনেক ক্ষেত্রে নারীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয় এমনকি নিম্নবিত্তের পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের উপার্জিত আয় নিয়ে নিচ্ছে এবং টাকা দিতে না চাইলে মারধর করছে। পুরুষের এই দায়িত্বহীন আচরণ নারীরা মেনে নিচ্ছে না।

স্বামীর পরকীয়া
স্বামীর পরকীয়া বিবাহ বিচ্ছেদের আরেকটি বড় কারণ। পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এমন অনেক পুরুষ পরনারীতে আসক্ত। তারা স্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছে না এবং স্ত্রীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করছে।  নিজেদের পূর্ব সম্পর্ক বা ভালোবেসে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েও কিছু পুরুষ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে।  স্বাবলম্বী ও শিক্ষিত নারীরা এর কোন সমাধান করতে না পারলে বিবাহ বিচ্ছেদের দ্বারপ্রান্ত হন।

স্বামীর হীনমন্যতায় ভোগা ও সন্দেহপ্রবণতা
কিছু সংখ্যক পুরুষ, নারীর শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া এবং কর্মক্ষত্রে স্বামীর চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন মেনে নিতে পারে না। বেশিরভাগ সময় স্ত্রী কিছু না বললেও স্বামী একধরনের হীনমন্যতায় ভুগে। আর এই হীনমন্যতা থেকে বিভিন্ন অজুহাতে মানসিকভাবে স্ত্রীকে হেনস্তা করে। পারিবারিক, সামাজিক বিভিন্নভাবে চাপে ফেলে এবং নিজেদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে। সাইকোলজি এটাও বলে যে, আত্ববিশ্বাসী অথবা অকপটে কথা বলে এমন নারীদের অনেক সময় বেয়াদব ভাবা হয় কিংবা পুরুষরা ভয় পায়, যার ফলাফল দাঁড়ায় মেয়েরা কথা শুনে না বা আমাকে (স্বামী) মেনে চলে না এমন সব অজুহাতে অনেক বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে এবং এখানে মেয়েকেই দোষারোপ করা হয়।  হীনমন্যতার কারণেই স্ত্রীর ওপর অকারণে সন্দেহ করে এবং হুমকি দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বামী, স্ত্রী অবাধে নিজেদের সীমা অতিক্রম করে। ফলে তা নারী পুরুষ উভয়েরই অনেকক্ষেত্রে নৈতিকতার ক্ষয় হয় এবং এই অবাধ ও অনৈতিক আচরণের কারণের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

নারীর পর এবংকীয়া অর্থনৈতিক আকাংখা
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর কারো সাথে সম্পর্ক হলে, আশার সাথে প্রত্যাশার ঘাটতি হলে এবং অর্থনৈতিক আকাংখা ও লোভের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ বিচ্ছেদ ঘটে থাকে।

সমাধান
দাম্পত্য জীবনে কলহ বা সমস্যা সৃষ্টি হলে তা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

কাউন্সেলিং
এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ড. ফারাজানা রহমান বলেন, ‘স্বামী স্ত্রীর মাঝে যে কোন সমস্যা দেখা দিলে প্রথমে নিজেদের সমাধান করতে হবে। কাজ না হলে পরিবারের গুরুজনদের দিয়ে সমাধান করতে হবে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরলে তা সমাধানে কাউন্সেলিং করতে হবে। আমাদের দেশে সেই পরিবেশটা এখনো তৈরি হয় নি কিন্তু এটা খুবই জরুরি বিষয়। দাম্পত্য কলহে অবশ্যই কাউন্সেলিং নিন। বর্তমানে দেশে অনেক বিশেষজ্ঞ মনোবিদ রয়েছেন।’

বিশ্বস্ততা অর্জন ও নৈতিকতা
সহকারী অধ্যাপক মনোবিজ্ঞানী ড. জোবায়ের মিঞা বলেন, ‘স্বামী স্ত্রীর মাঝে কোন কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি করা যাবে না এবং শুরু থেকেই নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া থাকতে হবে। একে অন্যের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে। কখনোই নিজের সীমা অতিক্রম করা যাবে না ও পারিবারিক নৈতিকতা ধরে রাখার প্রতি সচেষ্ট থাকতে হবে।’

আত্মমর্যাদা ও যৌতুককে না বলা
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট.সালমা আলী বলেন, ‘একজন আইনজীবী হিসেবে আমি এমন একজন নারীও পাইনি যে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখার সর্বাত্বক চেষ্টা করেনি। বিবাহ বিচ্ছেদ একটি নারীর জন্য কখনোই সহজ কোন বিষয় নয়। তাই বিয়ের আগে পাত্র সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিন। যৌতুককে না বলুন এবং যৌতুক চায় এমন ছেলের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিবেন না। কেননা সেই ছেলের আত্মমর্যাদা নেই তাই সে আপনার মেয়ে কেউ মূল্যায়ন করবে না।

দাম্পত্য কলহের সমাধানে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ; ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা করলে তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রী) পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তিচাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত। -সূরা নিসা (৪) : ৩৫"

অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক জিদ ও বিদ্বেষের কারণে যখন আশঙ্কা হয় যে, তারা নিজেরা বিবাদ মীমাংসা করতে পারবে না তখন দুই পক্ষের আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন একজন করে সালিশ নিযুক্ত করে দেওয়া হবে এবং মীমাংসার জন্য তাদেরকে স্বামী-স্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। আত্মীয়রাই তো তাদের অবস্থা ভালো জানবে এবং এদের কল্যাণকামিতার প্রত্যাশাও তাদের কাছে বেশি করা যায়।

শীর্ষ সংবাদ:
রাজধানীতে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা         সেতু আছে; রাস্তা নেই, সংযোগ সড়ক!         আমার বিশ্বাস সঠিক বিচার পাব: পরীমণি         মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নারীদের চাকরি         ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসএফকে দক্ষ করা হচ্ছে’         ‘দুর্যোগেও চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় স্থানে’         দেশে এক ডোজের করোনা টিকার অনুমোদন         মাদক মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে নাসির-অমি         অনিয়ম মোকাবিলায় হজ ও ওমরাহ পরিচালনা বিল পাশ         ডিবি কার্যালয়ে পরীমণি         জিততে পারল না আর্জেন্টিনা         আজ বর্ষার প্রথম দিন         চীনা কুকুর ছিনিয়ে নিলো বিজয়ের মুকুট         পরীমণির মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ         পরীমণিকে ডিবি কার্যালয়ে ডাকা হয়েছে         আপনারাই আমার সাহস: পরীমণি         আফগানিস্তানের নারী পুলিশ সদস্যরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন         গার্ড অব অনারে নারী ইউএনও'র আপত্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি         জাতিসংঘ মিশনে ‘বঙ্গবন্ধু লাউঞ্জ’         ফেনীতে একসঙ্গে ৪ কন্যাসন্তানের জন্ম         ‘নারীর অধিকার দেয়ার ব্যাপারে সৌদি পুরুষ ভীষণ ভীত’