সোমবার, ৭ আষাঢ় ১৪২৮
২১ জুন ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

‘চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে’

জয়িতা শিল্পী: বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর বেড়ে ওঠা ও নিজেকে কর্মক্ষম গড়ে তোলার জন্য যে একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও পরিবেশ প্রয়োজন সেটি অর্জন করা সহজ নয়। আমাদের সমাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি মেয়ে অবহেলায় জন্ম গ্রহণ করে, নানান প্রতিবন্ধকতার মাঝে বড় হয়। সেখানে নিজের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ কিংবা স্বপ্ন দেখার সুযোগ কম। নারীদের এগিয়ে নিতে, স্বপ্ন দেখাতে হয়, নারীর মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করতে হয় যে নারী শুধু মা নয়, বোন নয়, স্ত্রী নয়। নারী সহকর্মী হয়। নারী নেতৃত্ব দিতে পারে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করলে জনণের পুলিশ হয়ে কাজ করা সম্ভব। মানুষকে ন্যায় বিচার দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষ আইন সম্পর্কে অজ্ঞ তাই আইন মান্যতার প্রবণতা একেবারেই কম। আইনের প্রয়োগ বা কাউকে আইন মানতে বাধ্য করা জনপ্রিয় কাজ নয় তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজটি করতে হয়। বিভিন্ন কৌশল বা পন্থায় মানুষকে আইনের আওতায় আনতে হয়। আইনের শক্তি এক্ষেত্রে বড় শক্তি। ভয় দেখিয়ে কাউকে আইন মানতে বাধ্য করা যায় না। বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে তথা অপরাধ দমনও সহজ হবে।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ যখন রোল মডেল তখন একথা অনস্বীকার্য নারীরা অনেকখানি এগিয়েছে। এই অগ্রযাত্রায় আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব ও বলিষ্ট পদক্ষেপই মূল। সেবামূলক পেশার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীদের প্রবেশের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে নারীরা সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে পুলিশ সুপার হিসেবে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন দক্ষতার সঙ্গে। উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ পেলে নারীরা তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে যেতে পারে এটিই তার প্রমাণ। শুধুমা পুলিশ সার্ভিস নয় অন্যান্য চ্যালেঞ্জিং পেশাতেও নারীরা এগিয়ে আসছে এবং তারা কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে।

ছোট বেলা থেকে পুলিশ হব এরকম স্বপ্ন দেখেছি তা নয়। সময়ের সঙ্গে স্বপ্নগুলো পাল্টে যায়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছি বলে ছোট থেকেই গান বাজনা, সাহিত্য চর্চায় আগ্রহ ছিল। স্কুল জীবনে সংগীত শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কলেজে এসে লেখালেখি শুরু। তখন থেকে কবিতা লিখি, প্রবন্ধ লিখি, কলেজের অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম আর ভেবেছিলাম কন্ঠ শিল্পী হবো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে স্বপ্নগুলো পাল্টে যেতে থাকে। তখন সমাজ কর্মী হবার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। একাডেমিক শিক্ষা শেষের আগেই টিউশনি করানো, পার্টটাইম চাকুরি এসব কাজ করেছি। এনজিওতে কাজ করেছি। কলেজে পড়িয়েছি। এরপর হঠাৎ মনে হলো পাবলিক সার্ভিসে যোগ দিতে হবে। অমনি সবকিছু ছেড়েছুড়ে বিসিএস পাশ করার জন্য উঠে পড়ে লাগলাম। ততদিনে সমাজের বাস্তবতা, নারীদের অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পেরেছি।

পরিবারে তিনটি বোনের মধ্যে সবার বড়। একটি ভাই ছিল না বলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হতো। তাই মনে হতো আমাকেই এটা নিশ্চিত করতে হবে। নিজের নিরাপত্তা এবং পরিবারের নিরাপত্তা সবই শুরু হলো নতুন স্বপ্ন দেখা পুলিশ অফিসার হবো। এএসপি হিসেবে ২৭ তম বিসিএসে ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর যোগদান করি। সারদায় এক বছরের কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আজও মনে পড়ে সারদায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রবেশের পথে লেখা ‘ঝধৎফধয গধশবং ধ গধহ চড়ষরপব’

বরিশাল জেলায় ৬ মাসের প্রবেশনার পিরিয়ড শেষ করে যোগদান করি মাগুরা জেলায়। এএসপি সার্কেল ও এএসপি সদর পদে ২ বছর কাজ করি। ঐ সময় থেকে গভীরভাবে উপলব্ধি হয় সমাজের নিরীহ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা, নারীদের বঞ্চনা, পারিবারিক কলহ, বৈষম্য, নিপীড়ন ইত্যাদি সম্পর্কে। দরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়। আইনি পরামর্শ ও আইনি সহায়তা দিয়ে এবং ধৈর্য্য নিয়ে মানুষের কথা শুনলেই অনেক সময় সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দিয়ে অনেক কঠিন কাজও খুব সহজভাবে করা যায়। শুরু হয় পুলিশী জীবনের নতুন যাত্রা। কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাই। নতুন কর্মোদ্দীপনায় দৌড় ঝাঁপ করে, মানুষের উপকারের পিছনে ছুঁটে কী যে অপার আনন্দের অনুভূতি তা বলে বোঝানো যায় না।

এ যাবৎ সেই চেষ্টা অব্যাহত আছে। মাগুরা জেলা থেকে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ। সেখান থেকে আন্তজার্তিক শান্তি রক্ষা মিশনে ডেমোক্রেটিব রিপাবলিক অব কঙ্গো গমন কর্মজীবনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ফিরে এসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে তিনটি বছর বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা। বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশে একটানা ৪ বছরের অধিক সময় কর্মকালীন মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা একটি বড় অর্জন।

এরই মাঝে সংসার এবং সন্তান। সবকিছুর সমন্বয়ে চলছে জীবন। চলছে লেখালেখি। পুলিশে যোগদানের পূর্বে বেশ কিছুদিন বাংলাদেশ বেতারে কাজ করেছি। সেটি ছিল আমার আরেকটি ভালো লাগার জগৎ। কন্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে খুব আনন্দ পাই। বেতারে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি করেছি। আবৃত্তি শিল্পীও ছিলাম। পুলিশিং পেশায় জড়িত হবার পর থেকে নিজের সাংস্কৃতিক জগৎটাকে প্রায় হারিয়ে ফেলতে শুরু করলাম। গান আবৃত্তির পরিবর্তে লেখিলেখিতে জোর দিতে শুরু করি।

২০১৩ সালে ১ম প্রকাশনা ছিল কাব্যগ্রন্থ ‘জলে দাগ কেটে দিও’। তারপর ২য় প্রকাশনা ২০১৭ সালে প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রাজারবাগে প্রজার পুলিশ’। সেই থেকে প্রকাশনা অব্যাহত আছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের অমর ২১ শে গ্রন্থমেলায় ৮ম প্রকাশনা হলো কাব্যগ্রন্থ ‘করোনাময় সূর্যোদয়’। আমার লেখার একটি বেশিরভাগ অংশ জুড়ে থাকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এছাড়া নারী জাগরণ এবং সমসাময়িক বিষয়াবলী। লেখক হিসেবে পরিচিতি দারুনভাবে উপভোগ করি।

পুলিশ জনগনের বন্ধু কি না ? এটি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। পুলিশের কাজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃংখলা রক্ষা ও কর্মজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। এই কাজ করতে গিয়ে পুলিশকে বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে হয়। এই আইন প্রয়োগের কাজটি কখনো জনপ্রিয় হয় না। কারণ মানুষ স্বভাবত আইন মানতে চায়না। বরং রাষ্ট্রীয় শৃংখলার জন্য আইন মানতে বাধ্য করা হয় এবং এই কাজের মূল দায়িত্ব পুলিশের উপর বর্তায়। তবে পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করলে জনগনের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।

সম্প্রতি কোভিড-১৯ ঠেকাতে ফ্রন্ট লাইন ফাইটার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ যে মানবিক পুলিশিং এর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা সর্বজনের স্বীকৃতিও পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা পুলিশকে বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্র চলতে পারে না। পুলিশের কাজটি সহজভাবে পরিচালনার জন্য সকলের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘জনগনের পুলিশ’-আমরা সেই প্রেরণা নিয়েই কাজ করছি।

নারীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী। উপযুক্ত শিক্ষা, বাস্তবতার জ্ঞান না থাকায় তার নিজেদের অবস্থান, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ভালোমন্দ জানেন না এবং বুঝতেও পারেন না। নারীদের গৃহবন্দী মনোভাব ও আচরণ শুধু নারীর নারীত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করে। নারী যে একজন মানুষ এই উপলব্ধি জাগানো প্রয়োজন। নারীদের এগিয়ে নিয়ে এখনো অনেক কাজ করা প্রয়োজন। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। যেতে হবে বহুদূর। আমার ভিতর যে প্রাণশক্তি তা আমি অন্যের ভিতরে জাগানোর চেষ্টা করি। শিখাতে চাই কীভাবে ভালোভাবে বাঁচা যায়। নারীদের স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করি নিজে সাবলম্বী হবার, নতুন কিছু করার। নারীর এই সাহসটা থাকে না, চেষ্টা করি সাহস যোগাতে। সকলের সহযোগিতায় সকলে হাত ধরে টেনে নিলে নারীরা এগিয়ে যাবেই। শুধু মাথা উচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে হবে। স্বপ্ন দেখাতে হবে ডানা মেলে উড়বার। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চির কৃতজ্ঞ সেই স্বপ্ন দেখার পথটি মসৃন করে দিতে যিনি অগ্রপথিক। জয় হোক সকল নারীর।

লেখক: পুলিশ সুপার

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
ধানমন্ত্রীকে কটূক্তি: টাঙ্গাইল পৌর প্যানেল মেয়রের পদ স্থগিত         বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হলেন শেখ ইউসুফ হারুন         স্মার্ট ফোন কিনে না দেওয়ায় তরুণের আত্মহত্যা         যেভাবে ঘুমালে ত্বকের সৌন্দর্য্য বাড়ে!         ভোটগ্রহণ ভালো হয়েছে: ইসি সচিব         সাংবাদিক নির্যাতন দিবসে অবিলম্বে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের দাবি         হাতকড়ায় বাঁধা দম্পত্তির ভালোবাসার গল্প         ‘তার কাছে বেগম জিয়ার চেয়েও চিত্রনায়িকা গুরুত্বপূর্ণ’         দেশের আরো ৭ জেলায় লকডাউন         ‘নারী কাউন্সিলরের ক্ষেত্রে ‘সংরক্ষিত’ কথাটি বাদ দিতে হবে’         বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির রহস্য ফাঁস         দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ         শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তদের জামিন স্থগিতই থাকছে         পুকুরে ডুবে কিশোরের প্রাণহানি         পরীমণির বিরুদ্ধে আবারো ভাঙচুরের অভিযোগ         ভালুকায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় প্রাণহানি ৩         মালয়েশিয়ায় আটক ১০২ বাংলাদেশি         চরফ্যাশনে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি ১         যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ শিশুসহ প্রাণহানি ১০         উন্নত দেশে অভিবাসন শুধুই কী প্রশান্তির!         যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকো সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো