বুধবার, ৯ আষাঢ় ১৪২৮
২৩ জুন ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

সমাজসেবায় তরুণ প্রজন্ম

হামিদা ইলা: সমাজের তরুণ প্রজন্মকে নানা সামাজিক সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যায়।  তারা নিজেরা সংগঠন গড়ে তোলেন। এসকল সংগঠনে তারা নিজেদের ইচ্ছায় কাজ করে যার ফলে তাদেরকে বলা হয় সেচ্ছাসেবী এবং উক্ত সংগঠনগুলোকে বলা হয় সেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সামাজিক সংগঠন।

এরকম চার স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়েই সাজানো হয়েছে এ প্রতিবেদন।

মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন:
মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন চট্টগ্রামের জালালাবাদ ওয়ার্ড এর কুলগাও বালুচরা গ্রামের এক বাসিন্দা। তিনি একটি বেসরকারি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক। অন্যদিকে তিনি সিটি কলেজ এর এমবিএ তে অধ্যয়নরত একজন ছাত্রও। এছাড়াও বর্তমানে তিনি জালালাবাদ কাউন্সিলিং অফিসে কর্মরত অবস্থায় রয়েছে।

সমাজসেবামূলক কাজে তার হাতে খড়ি হয় ২০১৩ সালে। পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমেই এ সকল কাজে তার আগ্রহের সূচনা ঘটে। তার প্রথম কাজটি ছিল রমজানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ইফতারের আয়োজন। এরপর থেকেই তিনি আর কখনো থেমে থাকেননি। একে একে এখানে ওখানে সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে করতে একটা সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন স্থায়ী কিছু করার। আর এই সিদ্ধান্ত থেকেই চট্টগ্রাম এর উন্মুক্ত পাঠাগার 'বায়ান্ন'—এর জন্ম।

২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেনসহ আরো বেশ কিছু সেচ্ছাসেবীর হাত ধরে শুরু হয় 'বায়ান্ন'—এর পথচলা। তিনটি উদ্দেশ্য মাথায় রেখে তৈরি করা হয় 'বায়ান্ন'।

প্রথম, তরুণ প্রজন্মকে পাঠাগারমুখী করা এবং তাদের মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তৈরি করতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করা।

দ্বিতীয়, সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রাথমিক কাজগুলো হল চট্টগ্রামের ৪১ টি ওয়ার্ড এ আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে পাঠাগার স্থাপন এবং এই পাঠাগার গুলোর আওতায় ঐসব এলাকায় কিছু সমাজ উন্নয়নমূলক কার্য সম্পাদনা করা। এভাবে পর্যায়ক্রমে পাঠাগারের আওতা পুরো দেশে ছড়িয়ে দেয়া। এবং তৃতীয় বা সর্বশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিটি পাঠাগারকে ডিজিটাল পাঠাগারে রূপান্তর করা। অপরদিকে এই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ তৈরি করা।

বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ: বই পড়া,'বায়ান্ন' পাঠাগার স্থাপনের মাধ্যমে বই পড়ার প্রতি সবার মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি ,বই পড়া প্রতিযোগিতা, বই সংগ্রহ ,বই বিতরণ।

• শিক্ষা সহায়তা: শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞান প্রদান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান

• নারীদের নিয়ে কার্যক্রম: নারীদের বিনামূল্যে দীর্ঘমেয়াদী আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ যা বর্তমানে চলমান রয়েছে,নারীদের যৌন হয়রানি থেকে রক্ষার্থে জনসমাগম হয় এমন স্থান সমূহে সচেতনতামূলক ব্যানার, পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ,বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন সমস্যা ও এর প্রতিকার নিয়ে সেমিনার আয়োজন
• স্বাস্থ্য:রক্তদান, সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা।
এগুলো হচ্ছে বায়ান্নর মূল কাঠামো বা ভিত্তি।

প্রতিষ্ঠালগ্নে সাজ্জাদ হোসেন যেমন বন্ধুবান্ধবের সহায়তা পেয়েছেন তেমন তার পরিবারও তাকে অনুপ্রাণিত করেছে এসকল কাজে এগিয়ে যেতে। সূচনালগ্নে ৫ জন সদস্য থাকলেও এখন এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ জন। তাদের হাতখরচ থেকেই চলছে এই সংগঠন। শুরুতে বিভিন্ন আয়োজনে ৫২ টাকা করে চাঁদা তুলে কার্যক্রম চালানো হতো। বর্তমানে প্রতিবছরই তারা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

যেমন, প্রতিবছর ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীকে এক বছরের শিক্ষা অনুদান প্রদান, রমজানে প্রায় ১০০০ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন ইত্যাদি। বর্তমানে তাদের আরো একটি প্রজেক্ট চলমান রয়েছে যেটির নাম হচ্ছে 'প্রজেক্ট প্রীতিলতা'; এই প্রজেক্টির মাধ্যমে নারীদের আত্মরক্ষা মূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এটি একটি ছয় মাস ব্যাপী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। প্রতি মঙ্গলবারে একটি করে প্রশিক্ষণ ক্লাস হয় যদিও লকডাউন এর জন্য এখন এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ওই প্রোজেক্টে অংশগ্রহণকারী নারীদের সংখ্যা ৪০ জন। এমনকি যে শেখায় তিনিও একজন নারী; প্রশিক্ষক সুস্ময়ী দাস 'বাংলাদেশ কিক ফাইটার ফেডারেশন'–এর একজন প্রশিক্ষিত সদস্য।
এভাবেই এগিয়ে চলেছে 'বায়ান্ন'। ২০১৮ সালে ইয়াং বাংলা সনদ পান এই সংগঠনটি।

পরিশেষে আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “এ পথে পা বাড়াতে হলে প্রথমেই একটি লক্ষ্য স্থির করে নিতে হবে এবং সেই লক্ষ্যের সূত্র ধরেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। কেননা লক্ষ্য ব্যতীত মানুষ একটি কম্পাস ছাড়া জাহাজের মতো।”

মোস্তাকিমা তাওরিন:
মোস্তাকিমার জন্ম ও শৈশব বগুড়াতেই। পড়ালেখার তাগিদে বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। মোস্তাকিমা কলেজ অব হোম ইকোনমিকস্, ইনস্টিটিউশনস্ অব ঢাকা ইউনিভর্সিটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং এন্টাপ্রেনরশীপ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের একজন ছাত্রী।
পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি জড়িত রয়েছেন নানা ধরনের সেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজসেবামূলক কাজের সাথে।
এই সংবাদদাতা তাকে তার অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: ‘ভলেন্টিয়ারিং–এর সাথে আমার সম্পৃক্ততা ২০১৯ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই। স্কুল জীবনে কখনো পাঠ্যক্রম বর্হিভূত কার্যক্রম বা সমাজসোমূলক কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়নি আমার। কিন্তু ঢাকায় আসার পর বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্পর্কে জানতে পারি আমি এবং ফেসবুকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কার্যকলাপ দেখে আমারও এসকল কাজে অংশগগ্রহণের ইচ্ছা জাগ্রত হয়।’

ওই ইচ্ছা থেকেই মোস্তাকিমার এ পথে যাত্রা শুরু। তার প্রথম কাজ শুরু হয় 'ভলেন্টিয়ার ফর বাংলাদেশ' (উইংস অব জাগো ফাউন্ডেশন)–এর একটি ক্যাম্পেইনে সেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যেটির শিরোনাম ছিল 'ওয়াটার বডি ক্লিনিং'; এটি ভলেন্টিয়ার ফর বাংলাদেশ, ওয়াটার এইড এবং কোকা কোলার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংগঠিত একটি ক্যাম্পেইন। ওই ক্যাম্পেইন–এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত লেকসমূহের দূষণ প্রতিরোধ করা।
এটি সবেমাত্র শুরু ছিল। এই বিরতিহীন যাত্রায় তিনি এরকম আরো অনেকগুলো ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছেন।
যেমন, 'ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ'—এর অধীনেই ২০১৯ সালের 'মাই রোড মাই রেস্পন্সিবিলিটি' ক্যাম্পেইন। যেটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
এসকল কাজের পর ২০২০ সাল থেকে শুরু করে বেশ কিছুদিনের জন্য 'ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ' এর কমিটি মেম্বার হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। এখান থেকেই 'জাগো ফাউন্ডেশন'এবং 'ভলেন্টিয়ার ফর বাংলাদেশ' এর সাথে যৌথভাবে কাজ করা শুরু হয় তার।

এসকল কাজের সূত্র ধরেই তিনি 'ন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যাসেম্বলি'—তে একজন প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি 'বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম'—এ অর্গানাইজিং ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে তিনি ইউনিসেফ এর লং টার্ম এনগেজমেন্ট ভলেন্টিয়ার হিসেবে আছেন। এর পাশাপশি তিনি 'ইউনাইটেড নেশানস্ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ'—এর সহযোগী সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছেন; এখানে তিনি ইয়ুথ বেইজড্ ম্যাগাজিন 'ওয়াই ম্যাগাজিন'—এর রিপোর্টিং টিম এ কাজ করছেন।
এছাড়াও তিনি 'আইস্যাক বাংলাদেশ'—এর আউটগোয়িং গ্লোবাল ট্যালেন্ট এর এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।
অপরদিকে তিনি 'ইয়ুথ অপরচুনিটিস অ্যাওয়ার্ড উইনিং অপরচুনিটি ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম'—এ ২০২০-২০২১ সালের ক্যাম্পাস এম্বাসেডর ছিলেন।

এসকল কাজে অংগ্রহণ করতে গিয়ে একজন নারী হিসেবে তিনি সম্মুখীন হয়েছেন বিভিন্ন বাধা বিপত্তির। যেমন, দেরি করে বাড়ি ফেরা। আমাদের সমাজ আজও মেয়েদের দেরি করে বাড়ি ফেরার বিষয়টা মেনে নিতে পারেনি। মোস্তাকিমার ক্ষেত্রেও একই। তার পরিবার সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকা পছন্দ করতেন না। কোনো প্রোজেক্টের কাজে রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে অনেক কথা শুনতে হতো তাকে। মা বাবার ক্ষেত্রেও মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা স্বাভাবিক কারণ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রে নারীরা আজও পরাধীন, আমাদের দেশ আজও নারীর সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

তবে মা বাবার তুলনায় মোস্তাকিমার বড় ভাইয়ের চিন্তাচেতনায় ভিন্নতা রয়েছে। তার ভাই তাকে এই ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করেছে, উৎসাহিত করেছে। তবে শুরুর দিকে তার মা বাবা এই বিষয়গুলো মেনে নিতে না পারলেও পরবর্তীতে কাজের মান ও পরিবেশ দেখে বিষয়গুলো ধীরে ধীরে তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

এসকল কাজে সমাজে বসবাসরত লোকেদের কাছ থেকে কী ধরনের সাড়া পেয়েছে তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ভলেন্টিয়ারিং কাজের সময় যখন আমরা রোদের মধ্যে প্ল্যাকার্ড এবং ব্যানার্স নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম তখন পথচারীরা ঠাট্টা বিদ্রুপ করত কেননা তারা ভাবতো আমরা লোকদেখানো কাজ করছি। তবে সমাজ যাই বলুক আমি মনে করি মানবতার জন্য বা সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতে কোনো লজ্জা নেই।’

সমাজসেবায় আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,‘সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেও যে অনেক ভাল কিছু করা যায় তা আমরা করোনাকালীন সময়ে বুঝতে পারছি। অনুদান সংগ্রহ থেকে শুরু করে, এই মহামারীতে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’
‘এছাড়াও ইন্টারনেটের ভয়াবহ নেশা কাটাতে এই ধরনের সামাজিক ক্রিয়াকলাপ অনেকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই জন্যে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের উচিত এসকল কাজে নিজ ইচ্ছায় এগিয়ে এসে সমাজ ও নিজের জন্য ভাল কিছু করা। কেননা এই সেচ্ছাসেবীরাই হতে পারে আগামী দিনের নেতা।’

‘এছাড়া আমি মনে করি এসকল কার্যক্রমে অংশ নেয়ার মাধ্যমে নিজের বিকাশ ঘটে যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুুত্বপূর্ণ। কেননা এসকল কর্মকাণ্ড একজন মানুষকে দায়িত্বশীল,সমাজের প্রতি প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সসহানুভুতিশীল হতে শেখায়।’
এভাবেই তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।


ইয়াসিন রহমান ইফতি:
উত্তরার বাসিন্দা ইয়াসিন রহমান ইফতি বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ ইন এইচআরএম এর উপর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করছেন। বই পড়ার পাশাপশি তিনি ভালোবাসেন বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে।
মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়– এ অধ্যায়নরত অবস্থায় একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে তিনি দেখতে পান এক বৃদ্ধ কাগজবিক্রেতা পথে বসে কাঁদছে; কারণ জিজ্ঞেস করাতে সে জানায় তার সেদিনের উপার্জন সে হারিয়ে ফেলেছে। ঘটনাটি শোনার পর ইয়াসিন তার টিফিনের টাকা থেকে জমানো টাকা ঐ দরিদ্র বৃদ্ধ লোকের হতে তুলে দেয়। সেদিন ঐ বৃদ্ধলোক স্কুল পড়ুয়া এই শিশুর হাত থেকে সাহায্য পেয়ে আরো অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে এবং মন ভরে ইয়াসিন এর জন্য দোয়া করে দেয়। এই ঘটনাটি ইয়াসিনকে একধরনের তৃপ্তি প্রদান করে আর এই ঘটনার সূত্র ধরেই সমাজসেবায় তার আগ্রহের সূচনা ঘটে।

এরও অনেক বছর পর ২০১৮ সালে ধানমন্ডিতে একবার এক পথশিশু তার কাছে ফুল বিক্রির আশায় এগিয়ে আসে কিন্তু ইয়াসিন প্রথমে বারণ করে দিলেও শিশুটি বলতে শুরু করে এই ফুল বিক্রির টাকা দিয়েই তার ক্ষুধা নিবারণ হবে। কথাটি শুনে তিনি কিছু না ভেবেই মেয়েটিকে খাবার কিনে দেয়। সেই তখন থেকে আজ অবধি এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে। মানুষ চাইলেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে; ইয়াসিন তারই এক প্রকৃত উদাহরণ। আর ইয়াসিনের ভাষ্যমতে সেদিন ঐ ছোট্ট মুখের প্রাণবন্ত হাসিটাই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল এসকল কাজে পা বাড়াতে।

বর্তমানে তিনি 'হোপ ফাউন্ডেশন' এর মালিক বা প্রতিষ্ঠাতা।
২০১৯ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর তার একক উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে 'হোপ ফাউন্ডেশন'। তার নিজ পরিবারই তাকে সর্বপ্রথম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমে খুবই স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করেন তিনি কারণ তখনো তার নাগাল ততোটা ছিল না। ধানমন্ডি বা উত্তরা বা এরকম কোন জায়গায় গেলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাওয়ানোর মধ্যেই তার কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০২০ এর মার্চ মাসে তার এক পরিচিত ছোটভাই তার সাথে কাজ করতে সম্মতি প্রদান করেন। এরপর তারা দুজন মিলেই একটি দল গঠন করে ফেলেন যেখানে তাদের উভয়ের পরিচিত কিছু সেচ্ছাসেবী একত্রিত হন।

'হোপ ফাউন্ডেশন' আনুষ্ঠানিকভাবে ফেসবুক পেজসহ যাত্রা শুরু করে ২৩ মার্চ ২০২০ সালে। ওই যাত্রায় ইয়াসিন ছাড়াও তার সাথে ছিল আরো ৮ জন সদস্য। যার বর্তমানে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫৫ জন। যে ৮ জন মিলে শুরু করেছিল তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগত কারণে এখন আর নেই। তবে ছিটকে পড়া সদস্যরা এখনো মাঝেমধ্যেই তাদের সাথে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাদের এই সংগঠনের ফান্ডিং মূলত নিজস্ব হাতখরচ থেকেই আসে, এছাড়াও তাদের ফান্ডিং এ সাহায্য করছেন তাদের  মা–বাবা, আত্মীয়স্বজন এমনকি তাদের প্রাক্তন স্কুলের বাংলা শিক্ষিকাও। ইয়াসিনের ভাষ্যমতে এসকল কাজ সংক্রান্ত যেকোন বিষয়ে তিনি সর্বদাই তার মাকে পাশে পেয়েছেন তারপরে পেয়েছেন তার বন্ধুদের। আর এটা সত্য যে কোন ভাল কাজে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে কাছের মানুষগুলোর থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা আর সহায়তা কঠিন পথকেও সহজ করে তোলে। এমনটিই ঘটেছে ইয়াসিনের ক্ষেত্রেও।

তাদের ফাউন্ডেশনটিতে ছেলে মেয়ে উভয় সদস্যই রয়েছে। বছরে দুবার তারা নিয়োগ প্রক্রিয়া চালায়। এরপর সদস্য সংগ্রহ করে তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ১ মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হলে তাদেরকে বিভিন্ন গ্রুপে নিয়োগ প্রদান করা হয় এবং এখান থেকেই তাদের কাজ শুরু হয়। গ্রুপগুলো হচ্ছে:
• হিউম্যান রিসোর্স
• পাবলিক রিলেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন
• ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড আইটি
• ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস
• প্রজেক্ট অ্যান্ড ফিল্ড ম্যানেজমেন্ট
ওই নিয়মসমূহের মধ্য দিয়েই চলছে 'হোপ ফাউন্ডেশন' এর কার্যক্রম।

সকলের উদ্দেশ্যে ইয়াসিন বলেন, ‘আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে এইটুকু বলতে পারি একদিন শুধু বাসার পাশের চায়ের দোকানের আশে পাশে খাবারের আশায় ঘুর ঘুর করা কোন বাচ্চাকে একটু খাবার কিনে দিন আর তার তৃপ্তি ভরা হাসিমাখা মুখটি দেখুন হয়ত এরপর আপনি নিজেই আর এসকল কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারবেন না।’

তাসফিয়া তামান্না:
তাসফিয়া তামান্না ঢাকার, বনানী-১১ এর একজন বাসিন্দা। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভর্সিটির মেজর ফিন্যান্স এর শেষ বর্ষের ছাত্রী।

স্কুল-কলেজ থেকেই তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজে বেশ আগ্রহী ছিল। হলি ক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন তিনি হলদে পাখির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং নানা ক্লাবের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। অপরদিকে কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় তিনি এবং তার বন্ধুরা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করতেন; কেননা তাদের কলেজের পাশেই ছিল ক্যাথলিক আশ্রম। এমনকি রানা প্লাজা ধসের পর তারা কলেজ থেকে সাহায্যের কাজও করেছিলেন। স্কুল কলেজের এসকল কর্মকাণ্ড থেকেই মূলত সামাজসেবার প্রতি তার আগ্রহের সৃষ্টি হয়। মানুষের উপকার ও সাহায্য করার মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি পেয়ে থাকে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেও তিনি নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেন।বর্তমানে তিনি 'গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন'–এর বিভিন্ন প্রোজেক্টের অন্যতম প্রজেক্ট, 'প্রজেক্ট কন্যা'–এর সাথে সম্পৃক্ত।

গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন:
বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি অনন্য পথ তৈরি  করতে এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে যুক্ত হতে গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনটি ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

লক্ষ্য:একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া যেটি বিশ্বব্যাপী সকল বাংলাদেশি জনগণকে একত্রিত করবে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে।
উদ্দেশ্য:
১. উন্নয়নমূলক প্রকল্প গুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন সাধন করা।

২. বৃহত্তর বাংলাদেশি প্রবাসী জনসংখ্যার দেশ গুলোতে অংশীদার সংগঠন স্থাপনে সহায়তা করা।

৩. ফাউন্ডেশনের সঠিক বিকাশ বজায় রাখার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান এবং রাজস্ব উৎপাদনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।

প্রজেক্ট কন্যা:
'প্রোজেক্ট কন্যা' গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের একটি প্রকল্প বা উদ্যোগ। এই প্রকল্পটি মূলত দারিদ্রপীড়িত এবং কুসংস্কার জড়িত অঞ্চলগুলোতে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে যেখানে ঋতুস্রাবকে একটি ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং যেখানে সমাজের ভ্রান্ত ধারণার প্রভাবে নারী স্বাস্থ্যের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রজেক্ট কন্যার মাধ্যমে ফাউন্ডেশনটিতে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবীরা বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী নারীদের নিরাপদ ঋতুস্রাব সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান করেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নারী শিক্ষার্থীরা ঋতুস্রাবের কারণে যাতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত না থাকে সে বিষয়েও তারা এই প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছেন।

 

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
চার কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে: জাতিসংঘ         রাজধানীতে ড্রেনে পড়ে নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার         বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা         জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম নারী ফাইটার পাইলট মাওয়া সুদান         বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোকে দেড় কোটি টিকা দেবে বাইডেন         আওয়ামী লীগের ৭২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ         আজ থেকে ৭ জেলার ট্রেন চলাচল বন্ধ         'শিগগিরই পরীক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে’         রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী সেনা প্রধানের সাক্ষাৎ         নিউইয়র্ক সিটি নির্বাচনে ৪ নারীসহ বাংলাদেশি ১৩ প্রার্থী         ‘নিজেকে সর্বোচ্চ যোগ্য’ করতে যোগব্যায়াম করছেন পরীমনি         বন্ধ করে দেওয়া হলো ঢাকার সব যাত্রীবাহী ট্রেন         ‘তাহসানের ওপর রাগ নেই, যত রাগ আমার ওপর’         পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সচেতনতা গড়তে হবে         বেশি বয়সেও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন সম্ভব         পীরগঞ্জে এমকেপি মানব কল্যাণ পরিষদ’র সংলাপ সভা         টাঙ্গাইলে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি         বিদেশে যেভাবে নারী পাচার করতেন নদী         ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে কঠোর হওয়ার আহ্বান সেতুমন্ত্রীর         খালেদাকে বিদেশে নিতে সরকারের কাছে বিএনপির দাবি