মঙ্গলবার, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮
১১ মে ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

খুব অল্প কয়েকজনকে মনের কথা বলা যায়

সালমা হাসান: আমার যখন অনেক মন খারাপ থাকে, অনেক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাই, আমি চুপ হয়ে যাই। আমি লিখিনা, কবিতা পড়িনা, প্রিয় গান শুনিনা। পারতপক্ষে আমি তা কারো সাথে শেয়ার করিনা, বলা যায় আসলে শেয়ার করতে মন চায়না। খুব অল্প হাতে গোনা দুএকজন মানুষ আছে যাদের কাছে আমি খোলা বইয়ের মত মন খুলে কথা বলতে পারি কিন্তু সময়, ব্যস্ত জীবন সব মিলে তাদের মাথাও কতটা খাওয়া যায়। মিষ্টি কথা বলতে অনেক মানুষ আছে কিন্তু সময়ের অভিজ্ঞতায় সবাইকে আমি এখন আর বিশ্বাস করিনা। অধিকাংশ মানুষই তিলকে তাল করতে ভালবাসে। যাই হোক, নামাজ এ সময় মেডিটেশনের মত চমৎকার কাজ করে। আলহামদুলিল্লাহ।

যাই হোক, গত কিছুদিন আমি চুপচাপ তাই কতজনের মেসেজ, কি ব্যাপার, সব ঠিক আছে নাকি? ভিডিও দাও না কেন? কি বলব, কেউ কি আসলেই কখন কেউ ক্যামন আছে মন থেকে জানতে চায়? মানুষের হৃদয় এখন আমার কাছে ভার্চুয়াল আর্টের মত মনে হয়। আসলে আমি হয়ত ফেসবুকে চুপচাপ, সময়ের সাথে দৌড়ে কুল পাচ্ছিনা।

২০১৬ সালে এক বছর মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে আমি জেনারাল প্র্যাকটিস স্পেশালিটি ট্রেনিং এ যোগ দেই। পরীক্ষার লিখিত আর ভাইবা দুটাই দিয়েছিলাম হেভিলি প্রেগন্যান্ট অবস্থায়, প্রাথমিক অবস্থায় ভয়ঙ্কর মর্নিং সিকনেস ছিল, বমি করা ছাড়া আর কিছু করতাম না আমি, শেষে হল প্রেগন্যান্সিজনিত ডায়াবেটিস। এক ইন্ডিয়ান বান্ধবীর বাসায় যেতাম, রাত অব্ধি থেকে পড়াশুনা করতাম তার সাথে। আমার খাবার দাবারের খেয়াল রাখত সে। রাতে তারিকের বাড়ি ফেরার সময় হলে বাসায় ফিরতাম বাসে করে বা কখনো তারিক গাড়ি নিয়ে আসত সময় সুযোগ হলে। ভোরে উঠে কনকনে শীতে হাঁটতে যেতাম সুগার কন্ট্রোল হচ্ছিল না তাই, ইনসুলিন নিতে বলা হল নিলাম না, জিদ চেপে গেল ডায়েট আর ট্যাবলেটেই কন্ট্রোল করবোই করবো। যত পড়াশুনা সব করতাম হাঁটতে হাঁটতে। ইন্ডিয়ান বান্ধবী পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় ফেইল করল, মন খুব খারাপ হল দুজনের। আমার তারপর ভাইবার জন্য পার্টনার খুঁজতে হবে। খুঁজে পেতে ভাইবার জন্য আরেকজনকে পেলাম। তখন আমার ডেলিভারি সময় কাছিয়ে এসেছে তাই সেই আমার বাসায় পড়তে আসতো। রত্না আপু নামের এক সত্যিকারের রত্ন আছে তিনি প্রায় সময় এটা সেটা রান্না করে খাওয়াতেন তখন আমাকে নাহলে হয়ত আমি মন আর শরীর দুটারই অপুষ্টিতে ভুগতাম।

ভাইবার দিন, প্রতিটা স্টেশনের রুমের বাইরে আমার জন্য চেয়ার রাখা ছিল, পানি রাখা ছিল। একেকটা স্টেশন শেষ করে পরেরটার সামনে দুই মিনিট বসতাম, অন্যদের জন্য এই সুব্যবস্হা ছিলনা শুধু আমার জন্য। ভাইবা শেষে ফরম ফিলাপ করতে হবে, যেহেতু ন্যাশনাল সিলেকশন মার্কিং হবে তারপর স্কোর অনুযায়ী পছন্দের প্রথম তিনটা ট্রেনিং লোকেশনে চান্স পেতে হবে। সেই তিন লোকেশন কী দিব জানা নেই, তারিককে ফোন দিলাম, গুগল ম্যাপ খুলে, এলাকা, মানুষ, লন্ডনের কত কাছে কত দূরে, ট্রান্সপোর্ট নানা হিসাব কিতাব করে ৩ টা জায়গা টিক দেয়া হল।

চান্স পেয়েছিলাম আমার সেকেন্ড চয়েসে। রেসাল্ট আসল আর যাইদ হাসানের জন্ম হল। উনার বয়স যখন নয় মাস হল আমি ছুটি শেষ করে কাজে যোগ দিলাম। নতুন শহরে আসলাম তখন তল্পিতল্পা বেঁধে। কেউকে চিনিনা এ শহরে। যাইদ কোথায় থাকবে, ডে কেয়ার, চাইল্ড কেয়ার কিচ্ছু জানিনা। নয় মাসের মিষ্টি বাচ্চাকে ফুল টাইম চাইল্ড কেয়ারে রেখে কাজ করবোনা সিদ্ধান্ত নিলাম। ওর বেড়ে উঠার সুন্দর সময়গুলো মিস করতে চাইনি, বাংলা শেখাতে চেয়েছি। এমন নানা ইচ্ছার কারণে আমি ট্রেনিং শুরু করলাম পার্ট টাইম। ফুল টাইম জেনারাল প্র্যাকটিস স্পেশালিটি ট্রেনিং শেষ করে ফেলা যায় তিন বছরে, তারমানে ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ তেই আমি সব ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে পারতাম যদি ফুলটাইম ট্রেনিং করতাম। আমার সাথের সবাই বেরিয়ে যখন যায় তখন মাঝে মাঝে একটু মন খারাপ হত, কিন্তু যখন যাইদের সাথে সপ্তাহের আড়াই দিন বাদে বাকি সব দিন আনন্দে কাটাতে পারতাম, একসাথে গরমের আলো ভরা দিনে ছড়া পরতাম, পিকনিক করতাম, ওর প্রতিটা মাইলস্টোন আনন্দ নিয়ে উপভোগ করতাম তখন বলতাম আলহামদুলিল্লাহ, দুইটা বছর দেরিতে স্পেশালিস্ট হলেও কোনো সমস্যা নাই।

অজানা অচেনা নতুন শহরটা, এর মানুষেরাও আমাদের আপন করে নিলো। তিন বছর বয়স পর্যন্ত যাইদকে আমার ডে কেয়ার এ দিতেই হয়নি। প্রথম যেদিন আমি কর্মক্ষেত্রে যাই, আমার কাজ ছিল কেম্ব্রিজে, আমাদের শহর থেকে ট্রেনে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে যেতে। যাইদ সেদিন ছিল সদ্য পরিচিত ডেইজি ভাবির কাছে, ট্রেনে উঠেই উনার ফোন পাই, আমি কিছু বলার আগেই উনি বলে উঠেন আমি জানি তোমার মনের অবস্থা এখন কী যাইদ ভালো আছে, তুমি নিশ্চিন্তে যাও। এভাবেই এ শহরের মানুষের সাথে সাথে শহরটাও আমাদের আপন করে নিলো একসময়। দুই দুইটা পার্ট এমআরসিজিপি পরীক্ষা যারা দিয়েছে শুধু তারাই জানে কত মাসের নাওয়া, খাওয়া, ঘুম এর পিছনে যায়। আরেক ভাবি আছেন উনি দুইটা পরীক্ষার আগেই টানা এক দুমাসের উপরে রান্না করে দিয়েছেন, আমি যখন লাইব্রেরিতে পরে থাকতাম উনি তখন যাইদকে স্কুল থেকে উনার বাসায় নিয়ে খাওয়া, বাচ্চাদের সাথে খেলায় মাতিয়ে রাখতেন। প্রথম পার্টের আগে নন্দিনীদির মাথা খেতাম গভীর রাত পর্যন্ত, ক্রিসমাস নিউ ইয়ার কোনোটাতে উনাকে রেহাই দেইনি। সেই মেডিকেল কলেজ হলিফামিলির হোস্টেল থেকে ইউকের মাটিতে এসেও নন্দিনীদির মুক্তি হলনা আমার কাছ থেকে। দ্বিতীয়টার আগে তার সাথে সাথে জ্বালিয়েছি আরেক ডাক্তারমশাই রুনি আপুকে, রুনি আপু শেষ সময়টা পাশে না থাকল, সাহস না দিলে কী হত কে জানে। এর মধ্যে দেশ থেকে আব্বু আম্মু আসলে যাইদের সময়টা সুন্দর কাটতো। অনেক সময় যাইদ অসুস্থ থাকত বিশেষ করে শীতের সময় হাসপাতালে দৌঁড়াদৌঁড়ি আমাদের জন্য সাধারণ ঘটনা। তাই তাতেও অনেক কাজে অনুপস্থিতি হয়ে যেতো।

এইভাবে একটু এদিক টেনে, একটু অদিক টেনে, কখনো কাজে একটু বেশি সময়, কখনো কম সময় এইভাবে তালগোল মিলাতে মিলাতে ২০১৮ সালের বদলে অবশেষে দুই বছর বেশি সময় লাগিয়ে ২০২১ এ এসে আমার ট্রেনিং এ মাসে শেষ হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। পরীক্ষা, ট্রেনিং সব গুছাতে গুছাতে এক সুপারভাইসর এর ইমেইল আসে যেখানে ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে আমি ৮ মাস কাজ করেছিলাম প্রায় ২ বছর আগে, বলেন আসো তোমার পুরনো কর্মক্ষেত্রে সবার সাথে দেখা করতে, গেলাম, সবাই বলল তোমাকে আমাদের অনেক পছন্দ, তোমার অন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকলে আমাদের এখানেই জয়েন কর। এভাবেই ট্রেনিং শেষ হওয়ার আগেই আমি জব পেয়েছি কোনোরকম ইন্টারভিউ ছাড়া। সব ঠিকঠাক থাকলে জুন মাসে শুরু হবে আমার কর্মক্ষেত্রের আরেকটা অধ্যায়।

এর মধ্যে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মত মেডিকাল ইনোভেশন আর এনট্রেপ্রেনরশিপে একটা ফেলোশীপ পেলাম অল্পকিছুদিন আগে। এর জন্য বাড়তি কিছু করিনি সত্যি বলছি। এই যে ফাঁকে ঝোঁকে ফেসবুক, এটা সেটা মিলিয়ে কিছু জনসচেতনতামূলক কাজ করি আনন্দ নিয়ে শুধু সেটাই, সেটা নিয়ে আমার ভিশনটাই জোর গলায় তুলে ধরেছি। এই নিয়েও নিন্দুকের কম কথা শুনি নাই রে ভাই? এইসব লোক দেখানো কাজ এমনটাও বলেছেন দু এক জন। কি থেকে কি হয়ে গেল, এই লোক দেখানো কাজেই ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস কত কত অ্যাপ্লিক্যান্টকে বাদ দিয়ে আমাকে ফেলোশীপ দিল। ইস্ ওরাও কত বোকা!

আমি হিমশিম খাচ্ছি কিন্তু হাল ছাড়ছিনা সেটার চাইতেও বড় সমস্যা হলো একজন
নারী হয়েও কেন আমি হালটা ছেঁড়ে না দিয়ে সাজুগুজু করে দাওয়াত পার্টিতে বেশি সময় দিলাম না, বাসায় পার্টি দিয়ে রান্নার কোর্স করে এন্টারটেইন করলাম না, যেন গিভ আপ করলেই প্রমাণিত হত আমি একজন সংসারী নারী! এদিক দিয়ে করোনা আমাকে মিথ্যা সামাজিকতা থেকে স্বাধীনতা এনে দেয়ায় আমি আবার খুব খুশিও।

মনে মনে ভাবি এই যে অনেক মানুষ আকারে ইঙ্গিতে পিছনে আমাকে নিয়ে নানান কথা বলে, আমি কাজকে প্রাধান্য দেই বেশি, আমার অনেক রুটিনমাফিক, অনেক পরিকল্পনামাফিক চলতে হয় বলে, আমার ঘর সংসার অনেক অনাদর অবহেলায় থাকে এমন ভাব করে কখনও পিছনে, কখনো সামনে কথা বলে, এরা কিন্তু কেউ কখনও আমার আমাদের ছোট ছোট এই টুকরো টুকরো দৈনন্দিন যুদ্ধে সামিল ছিলনা। যারা ছিল তাদের নাম আছে এখানে।

লেখার একদম প্রথম লাইনে বলছিলাম মন খারাপের কথা। মন খারাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। দেশে যাওয়ার জন্য পুরো পরিবারের টিকিট কেটেছিলাম চড়া মূল্যে, তিল তিল করে ছুটি জমা করেছি, বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিচারে হাঁপানি রুগী যাইদকে নিয়ে এখন দেশে যাওয়াটা অনিরাপদ মনে হচ্ছে। প্রতিবার দেশে গেলেই উনার একটা অ্যাটাক হয়, মুখে নেবুলাইসার লাগিয়ে আমরা কয়েকটা হাসপাতাল ট্রিপ দেই। বাংলাদেশকে যাইদ আমার চাইতে বেশি মিস করে, বছরে দুইটা ট্রিপ দিয়ে দিয়ে ওর অভ্যাস খারাপ হয়ে গিয়েছে। খুব আশা করে বসেছিল এই ইস্টার এর ছুটি বাংলাদেশে কাটাবে। আজ সিদ্ধান্ত হয়েছে টিকেট গচ্চা দেয়া হবে কিন্তু এ যাত্রায় ওর দেশে যাওয়া হচ্ছেনা। কথাটা জানানো মাত্রই মাটির দিকে মুখ গুঁজে ফ্লোরে শুয়ে থাকল কিছুক্ষণ, প্রচণ্ড মন খারাপ হলে আর চোখে পানি আসলেই ও শুধু এমন করে। অদিকে মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত জানতে পারলাম ইউকেতে ফিরে যে ১০ দিন কোয়ারান্টইন করতে হবে তা কাটা হবে আমার বাৎসরিক ছুটি থেকে, ছুটিই আছে সব মিলে ২০ দিন, কেমনে কী। করোনা সত্যি জীবনের কত সহজ ধাঁধা জটিল করে দিল।


একজন সাধারন মানুষ ও চিকিৎসক
২৭ মার্চ, ২০২১ 
 

শীর্ষ সংবাদ:
অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ নিয়ে গবেষণার ফল         চঞ্চলের পরিচয় নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির জোয়ার         ৫০০ পরিবারের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ         করোনা পরীক্ষার নতুন ফি নির্ধারণ         ‘চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে’         ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটা যাবে না’         যমুনা গ্রুপে চাকরি         কাল থেকে ঈদের ছুটি শুরু         পন্টুনের তার ছিঁড়ে মাইক্রোবাস নদীতে         বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে বাংলাদেশ         বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা         ‘চীনকে চিঠি দিয়েছে সরকার’         কানাডায় ভ্যাকসিন: 'ম্যাচ অ্যান্ড মিক্স' এর পরিকল্পনা         চঞ্চল চৌধুরী, তুমিই মানুষ!         সমাজসেবায় তরুণ প্রজন্ম         করোনাভাইরাস ছড়ায় যেভাবে         চলছে সন্ধ্যা রায়ের জীবনমরণ লড়াই         দেশে টাকায় মিলল করোনার উপস্থিতি         বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল থাইল্যান্ডও         আমার সবকিছুর মৌলিক ভিত্তি আমার মা: জয়া