বৃহস্পতিবার, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮
১৩ মে ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

কোভিড-১৯ : রপ্তানি বাণিজ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ

মো. আব্দুল লতিফ বকসী: কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যে যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। তবে দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। করোনার কারণে সারা বিশ্ব যখন স্তব্ধ, তখনও বাংলাদেশ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলকারখানা চালু রাখতে পেরেছে।

দেশের প্রধান রপ্তানিখাত তৈরি পোশাক। করোনার কারণে অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল করা হয়েছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে। পোশাক শিল্পের সফলতা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। দেশের রপ্তানির প্রায় ৮১ ভাগ আসে এ খাত থেকে। সংগত কারণেই বাংলাদেশের জন্য এ শিল্পখাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর রপ্তানি বাণিজ্য হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। সাথে সাথে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগও এসেছে দেশের জন্য। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন বিনিয়োগ করতে।

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যান্য খাতের মতো তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরমধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখার জন্য ৫,০০০ কোটি টাকা, পরে তা আরও বাড়ানো হয়েছে।  ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ সুবিধা প্রদান ৪০,০০০ কোটি টাকা, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফাণ্ডের আকার ৩.৫ বিলিয়ন ডলার হতে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং এর সুদের হার ১.৭৫ শতাংশে নির্ধারণ খাতে ১২,৭৫০ কোটি টাকা, রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামের ঋণ সুবিধা চালু করার জন্য ৫,০০০ কোটি টাকা, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের কর্মহীন এবং দুঃস্থ শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে ১,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রয়োজনে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এতে করে বিশ্বমন্দা অর্থনীতির মাঝেও বাংলাদেশের রপ্তানিখাত সচল রয়েছে। ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য।

বাংলাদেশের রপ্তানি রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে সরকার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়ার ফলে রপ্তানি বাণিজ্যের উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে। সংগত কারণে রপ্তানিবাণিজ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হচ্ছে। রপ্তানি ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের জন্য সরকার ২ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ ভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। আজ বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে রাতারাতি বাংলাদেশর এ সফলতা আসেনি। দেশে-বিদেশে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ আজ এ অবস্থানে এসেছে। এ শিল্পের উপর একের পর এক প্রতিবন্ধকতা এসেছে, বাংলাদেশ তা দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড উপখাত গড়ে উঠেছে। এক সময় তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহৃত কাটুন থেকে শুরু করে সকল এক্সেসরিজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। আজ দেশের চাহিদা পূরণ করে এসকল এক্সেসরিজ বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। বর্তমানে এ খাতে ৪.১ মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করছে, এর অধিকাংশই নারী। বাংলাদেশের জনশক্তির প্রায় অর্ধেক নারী, এ বিপুল সংখ্যক নারী জনশক্তিকে উৎপাদনশীল খাতে অবদান রাখার সুযোগ করে দিয়েছে তৈরি পোশাক খাত। অন্যান্য খাতগুলো রপ্তানিমুখী হলে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। বিশ্ববাণিজ্যে দক্ষতার সাথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ববাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। সময়োপযোগী রপ্তানিনীতি গ্রহণ এবং এর সঠিক বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের মধ্যে একটি দক্ষ রপ্তানি কারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে।

বস্ত্রখাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায়; বিনাশুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা; ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র লেখার সুবিধা: হ্রাসকৃত শুল্কে মেশিনারিজ আমদানি; তৈরি পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স প্রতিপালন নিশ্চিত করতে সরকার বিনাশুল্কে ফায়ার ডোর ও এ সংশ্লিষ্ট ইক্যুইপমেন্ট আমদানির সুযোগ করে দিয়েছে; রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্রখাতে শুল্কবন্ড ও ডিউটি ড্র ব্যাক এর পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ হারে প্রদান করা হচ্ছে; বস্ত্রখাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে প্রদত্ত নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে; ইউরোপ অঞ্চলে রপ্তানির জন্য প্রচলিত ৪ শতাংশ এর বেশি আরও ২ শতাংশ বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে; রপ্তানিমুখী শিল্পের অনুকূলে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড হতে অতি অল্প সুদে কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদানের সুযোগ রয়েছে, বর্তমানে এ ফান্ডে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রয়েছে; তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে ১২ শতাংশ এবং গ্রিন ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর্পোরেট কর হারবহাল রয়েছে।

রপ্তানি পণ্যসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পণ্যভিত্তিক রপ্তানিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর একটি পণ্যকে “বর্ষপণ্য” বা প্রডাক্ট অব দা ইয়ার ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছরের মতো ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যকে “পণ্যবর্ষ-২০২০” ঘোষণা করেছেন। প্রনোদনাসহ নানাবিধ নীতি সুবিধা প্রদানের নিমিত্ত বাইসাইকেল, মটরসাইকেল, অটোমোবাইল, অটোপার্টস, ইলেকট্রনিক্স, একুমুলেটর ব্যাটারি, সোলার ফটোভলটিক মডিউল ও খেলনাকে “বর্ষপণ্য-২০২০” এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পণ্য বহুমুখী করণের লক্ষ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার (লেদার-নন লেদার), লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, এবং প্লাস্টি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১,০১২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে “এক্সপোর্ট কমপেটিটিভনেস ফর জবস” শীর্ষক ৬ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো- নির্ধারিত খাতের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন, রপ্তানি বাজারে প্রবেশের জন্য বিদ্যমান শর্তাবলি প্রতিপালন এবং বাজার সংযোগ বৃদ্ধিকরণ। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষভাবে একাজে সহযোগিতা করছেন। ২০১৯ সালে এ খাতকে উৎসাহিত করার জন্য“বাংলাদেশ লেদার ফুটওয়্যার, লেদারগুডস ইন্টারন্যাশনাল সোর্সিং শো” এর আয়োজন করা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। এতে দেশি-বিদেশি ক্রেতাসহ বিভিন্ন এ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, স্বনামধন্য ব্রান্ড, আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও ক্রেতা প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্য হলো- চামড়া খাতের রপ্তানি উন্নয়নে পথনকশা তৈরি করা। এ প্রকল্পের আওতায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে ১০ একর এবং কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, প্রায় ৫ একর জমির উপর নির্মাণ করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের দু’টি অত্যাধুনিক টেকনোলজি সেন্টার। ইতোমধ্যে জমিগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোম্পানি আইনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সংশোধন করেছে। এর ফলে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশ ৮ ধাপ এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের ৪৫টি দেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং এমওইউ স্বাক্ষর করা হয়েছে। যার আওতায় খাত ভিত্তিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

এলডিসি সদস্যদেশ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নত দেশে প্রায় শতভাগ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চিলি ও থাইল্যান্ড হতেও উল্লেখযোগ্য  শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রপ্তানি ও সেবা খাতে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি সম্ভব হয়েছে। অতিসম্প্রতি জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণার চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে। তা কার্যকর হবার পর বাংলাদেশ আর এলডিসিভুক্ত দেশের বাণিজ্য সুবিধা পাবে না। ওই সময়ের পর বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নত দেশ থেকে জিএসপি প্লাস নামে বাণিজ্য সুবিধা পাবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ভুটানের সাথে পিটিএ স্বাক্ষর করেছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশের সাথে পিটিএ বা এফটিএ স্বাক্ষর করে বাণিজ্য সুবিধা গ্রহণ করার জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ।

প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন অনেক দক্ষ। পণ্যের মান, মূল্য এবং বাণিজ্যে দক্ষতা অর্জনের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে আছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য।

Mujib Borsho

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ:
কানাডায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের ঈদ কাটছে যেভাবে         যশোরে কোয়ারেন্টাইনে ভারতফেরত নারীর মৃত্যু         উমা সেনগুপ্তের চিরবিদায়ে কানাডা প্রবাসীদের শোক         দেশে টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে         বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রথম জামাত সকালে         নিউইয়র্কে পুলিশের সার্জেন্ট হলেন বাংলাদেশি নারী         রামপুরায় বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ড         পথশিশুদের মাঝে ‘দশমিক’র পোশাক বিতরণ         জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সন্ধ্যায়         বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে বাংলাদেশেও ঈদ পালনের আহ্বান         দেশে চাঁদ দেখা যায়নি         ফেরিতে পদদলিত হয়ে পাঁচজনের প্রাণহানি         মিতু হত্যায় তিন লাখ টাকায় চুক্তি করেন বাবুল         বাবুল আক্তার ৫ দিনের রিমান্ডে         ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে শেখ হাসিনার চিঠি         ‘চীনা ভ্যাকসিনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই’         মামলার বাদীই হয়ে গেলেন মূল আসামি         মামলার বাদীই হয়ে যাবেন মূল আসামি!         শিমুলিয়ায় জনস্রোত         চীনের উপহারের ভ্যাকসিন এখন ঢাকায়         ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার যানজট