শনিবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭
২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

‘আবার এসেছে বসন্ত’

অরবিন্দ মৃধা: ষড়ঋতুর আবর্তে আবার এসেছে বসন্ত। বাঙালির বারমাসি সংস্কৃতির ধারায় বসন্ত ঋতুরাজ হিসেবে খ্যাত। শীতের জড়তা কাটিয়ে জীর্ণ-শীর্ণ প্রকৃতি মেতে ওঠে নতুন সৃষ্টির উৎসবে। বৃক্ষরাজি পাতা-পল্লব, ফুল-ফলে ভরে যায়। শীতের আমেজের সাথে মৃদু মৃদু দক্ষিণা বাতাস প্রাণে প্রাণে জাগায় শিহরণ। কোকিলের কুহুতান,আর নানা পাখির কলরবে প্রাণীকুল হয় পুলকিত। বসন্ত আসে ফুলের ডালি নিয়ে ভালবাসা নিয়ে। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঢলাঢলি করে পরাগায়ণ ঘটায়। মৃদুমন্দ সমীরণ প্রাণে প্রাণে মিলনের উচ্ছ্বাস ঘটায়। বাড়ি বাড়ি রসের পিঠা-পুলি,পায়েসসহ নানা রকম দেশী খাদ্য ভোজন আনন্দে মেতে ওঠে রসিক বাঙালি। সব মিলিয়ে ছয় ঋতুর বাংলায় বসন্ত আসে প্রকৃতির বরপুত্র রূপে।জেগে ওঠে আপন মহিমায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। বসন্তের সূচনা হয় ফাল্গুন মাসে। এই মাসকে ঘিরে কবি সাহিত্যিকের আবেগ অনুভূতি জড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গান কবিতা কেচ্ছা-কাহিনি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বসন্ত ঋতুকে ঘিরে গান কবিতার মাধ্যমে প্রকৃতি রঙকে একদিকে নানা রঙে রাঙিয়েছেন, অন্যদিকে
মানুষকে আনন্দমুখর এবং পার্বণমুখী করার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে ,ভারতচন্দ্রের কাব্যে বসন্ত বিষয়ে প্রকৃতি, কোকিল, মধুকর, প্রভৃতির মুখরিত আচরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থেন মতে, ‘বসন্ত আসে স্বয়ং স্বর্গ থেকে, প্রকৃতি পবিত্রতায় পুষ্পিত হয়, অতএব এখন শোক করবার সময় নয়।’

বাংলার গ্রামগজ্ঞ,শহর, বন্দর ফাল্গুনের আগমনকে ঘিরে আনন্দ গানে মেতে ওঠে। মেলা বসে,বসে জারি-সারি, ভাব, কবি, কীর্তন, ভাসান, ভাওয়াইয়া গানের আসর। ফাল্গুনকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, ‘ফাগুনের নবীন আনন্দে, গান খানি গাঁথিলাম ছন্দে ছন্দে,দিল তারে বনবীথি কোকিলের কলগীতি,ভরি দিল বকুলের গন্ধে’, ‘আকাশ আমায় ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে’, ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’ ওগো দখিন হাওয়া ও পথিক হাওয়া’ ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে, হারাই ক্ষণে ক্ষণ’ প্রভৃতি। ফাগুনকে কবি গান,কবিতা, সুরে-ছন্দে বিচিত্র রূপে মনের মাধুরি মাখিয়ে কাব্যিক ভাষায় সাজিয়েছেন। বসন্ত নিয়ে কবির উচ্ছাস অন্তহীন,গেয়েছেন, ‘আহা আজি এ বসন্তে এতো ফুল ফোটে, এতো পাখি গায়’, ‘আজ খেলা ভাঙার খেলা খেলবি’ ‘দখিন হাওয়া জাগো জাগো,জাগাও আমার সুপ্ত এ প্রাণ’, ‘আজ দখিন বাতাসে নাম-না-জানা কোন বনফুল ফুটল বনের ঘাসে।’ গেয়েছেন,’ ওরে পথিক ওরে প্রেমিক,বিচ্ছেদে তোর খন্ড মিলন পূর্ণ হবে”’প্রভৃতি গান।

রবীন্দ্র যুগের এক নবীন কালজয়ী বাঙালি বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, সম্যের কবি, জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিগুরুর দৃষ্টিতে উতলা বসন্তের জাগ্রতদূত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিলেন। ১৩২৯ বঙ্গাব্দ ১০ ফাল্গুন তিনি তাঁর ‘ বসন্ত’ গীতি নাটক কবি নজরুল ইসলামের নামে উৎসর্গ করে লেখেন, ‘শ্রীমান্ কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু।’ নজরুল তখন জেলে।ওই নাটকের পঁচিশটি গান ‘বসন্ত’ নামে স্বরবিতান ষষ্ঠ খন্ডে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে ‘জাতির জীবনে বসন্ত’ বলে অবিহিত করেছেন। নজরুলের চিন্তা-চেতনাকে তিনি বসন্তের সাথে, মানব চেতনা উন্মেষের সাথে তুলনা করেছেন। নজরুল কাব্যে মানবের জয়ধ্বনী রুদ্র ভৈরবের ন্যায় ধ্বনিত হয়েছে। বসন্ত যেমন প্রকৃতির চেতনায় শিহরণ জাগায়, নজরুলের গান কবিতায় তেমনি মানব চেতনায় শিহরণ জাগায়। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকার আর্শিবাণীতে বলেছেন, ‘আয় চলে আয় আয়রে ধুমকেতু, আধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দূর্গশীরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন, অলক্ষুণের তীলক রেখা রাতের ভালে হোকনা লেখা,জাগিয়ে দেরে ডংকা মেরে,আছে যারা অর্ধ-চেতন।’

নজরুলের ‘ বুলবুল ‘ চৈতী হাওয়া’ গ্রন্থে বসন্ত ধ্বনিত হয়েছে। যেমন,” আসে বসন্ত ফুলবনে,সাজে বনভূমি সুন্দরী” “আজও দখিনা হাওয়ায় ফাগুন জাগে,বুলবুলি নাই গুলিস্তানে” ” ফুটলো যেদিন ফাগুনে হায় প্রথম গোলাপ কুঁড়ি, বিলাপ গেয়ে বুলবুলি মোর গেল কোথায় উড়ি”,প্রভৃতি গান। তাঁর প্রথম সন্তান বুলবুল বসন্ত রোগে অকালে চলে যায়। তাই হয়তো বসন্ত তাঁর কাছে পান্ডুর হয়ে গানে ধরা দিয়েছিল!” তুই নাই বলে ওরে উন্মাদ পান্ডুর হল আকাশের চাঁদ”,। আবার রূপেও ধরা দিয়েছে। ফাগুন, হলি, রাধাকৃষ্ণ প্রেম নিয়ে তাঁর গান কবিতা মানব মনে সাড়া জাগায়। ” ব্রজগোপী খেলে হরি হরিরে,” “এলো নন্দের নন্দন নব ঘনশ্যাম”। নজরুল তাঁর ফাল্গুনী নাটকে দখিন হাওয়াকে বানিয়েছেন হৃদয়রাজ,কোকিল তাঁর বসন্তদূত।

নাতিশীতোষ্ণ ছয় ঋতুর বাংলায় ঋতুরাজ আসে মৌসুমি বায়ু,দাবদাহ,বৃষ্টি,ঝড়-ঝঞ্ঝা নানা রঙের বার্তা নিয়ে। শীতের শীর্ণতা,জড়তা কাটিয়ে প্রকৃতি সাজে ফুলে ফুলে,প্রাণীকুলের মাঝে জাগে জীবন বোধ,মানুষ মেতে উঠে খেলা-ধুলা আনন্দ গানে। আবহমান কালধরে বসন্ত আসে তার রঙের ডালি নিয়ে। প্রকৃতির উচ্ছলতায় মানুষ নব নব উদ্যমে বুক বাঁধে।।

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড