বৃহস্পতিবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

খাদ্য ব্যবস্থায় বিপ্লব

মো .ইফতেখার হোসেন: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি এসবকে বুঝায়”। জাতির পিতার দূরদর্শী চিন্তা-চেতনার পথ ধরে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও উদ্ভাবনী নেতৃত্বে সরকার নানমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে। যার ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব সাধিত হয়েছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেইসাথে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসকল কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাছ ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ দুধ ও ডিম উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১,১৮,০৪০ কোটি টাকা (৪.৯৭%) এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৫.৫১% এবং ৩.৪৭%। কৃষিজ জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান অংশ ৩৮.৭৬%। দেশের প্রায় ৪.৯ কোটি মানুষ (জনসংখ্যার প্রায় ৩১%) প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

মাংস ও মাছ উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ, ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে এবং দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ২৭.০১ লক্ষ মে.টিন যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ৪৬ লক্ষ মে.টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মাংস, দুধ ও ডিমের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১.০৮ মিলিয়ন মে.টন, ২.২৯ মিলিয়ন মে.টন ও ৪.৭ বিলিয়ন যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৭.৬৭ মিলিয়ন মে.টন, ১০.৬৮ মিলিয়ন মে.টন ও ১৭.৩৬ বিলিয়ন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর সুপারিশ অনুযায়ী একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ন্যূনতম ২৫০ মি.লি দুধ ও ১২০ গ্রাম মাংস, বছরে ১০৪টি করে ডিম এবং ৬৩ গ্রাম মাছ খাওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে দুধ, মাংস, ডিম ও মাছের জনপ্রতি প্রাপ্যতা যথাক্রমে ১৭৫ মি.লি/দিন, ১২৬ গ্রাম/দিন,  ১০৪ টি/বছর ও ৬৫ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। বিগত ৩ বছর বিদেশ হতে গরু আমদানি ব্যতিরেকে দেশীয় গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে।

সারাবিশ্বে ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশী আহরিত হয় এদেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে। ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ ইলিশ’ ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) নিবন্ধন প্রাপ্ত হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২.৯৮ লক্ষ মে.টন যা ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ৫.৩৩ লক্ষ মে.টন।  

বর্তমান সরকারের উল্লিখিত মৎস্যবান্ধব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কারণে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার The State of World Fisheries and Aquaculture 2020 ২০২০ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৩য় স্থান ধরে রেখে বিগত ১০ বছরে স্বাদু পানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থান গত ছয় বছরের মতোই ধরে রেখেছে।

মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) বিদ্যমান সমস্যা ভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তিনটি নতুন প্রযুক্তিসহ এ পর্যন্ত মোট ৯০টি প্রযুক্তি/প্যাকেজ উদ্ভাবন করেছে।

বিএফআরআই এ পর্যন্ত মোট ৬১টি মৎস্যচাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ৬৪ প্রজাতির মধ্যে ২৪ প্রজাতির মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন ও জিনপুল সংরক্ষণ করেছে বিএফআরআই। দেশীয় মাছ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে বিএফআরআই সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মত মাছের লাইভ জীন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে।

ব্লু ইকোনমি নব দিগন্ত উন্মোচন এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ হওয়ায় ১,১৮,৮১৩ বর্গ কি.মি. এলাকায় মৎস্য আহরণে আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাইলট কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশ Blue Growth Economy নামে অভিহিত সমুদ্র অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং Ges Indian Ocean Tuna Commission (IOTC) এর সদস্যপদ অর্জন করেছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সর্বোচ্চ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর তথা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় হতে ২০১৪ সালে একটি স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের কর্মপন্থা (Plan of Action) প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালে উক্ত পরিকল্পনা এসডিজি এর সাথে সমন্বয় করে ২০১৮-২০৩০ খ্রি. পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়েছে। ‘সামুদ্রিক মৎস্য আইন-২০২০’ একাদশ জাতীয় সংসদে ইতোমধ্যে পাশ হয়েছে এবং “জাতীয়

সামুদ্রিক মৎস্য নীতিমালা” চূড়ান্তকরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মৎস্য সম্পদ আহরণের মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতির নবদিগন্ত উন্মোচন করার জন্য এ মন্ত্রণালয় নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। চাষকৃত মাছের উৎপাদন ২০১৭-১৮ সালের (২৪.০৫ লক্ষ মে.টন) তুলনায় ২১ শতাংশ এবং মোট মাছের উৎপাদন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা, ইলিশের উৎপাদন ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় মৎস্য পরিদপ্তরের অন্যতম লক্ষ্য সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান লক্ষ্য। অপরদিকে মাংস ও ডিমের মতো দুধেও স্বয়ংসম্পর্ণতা অর্জন করে প্রাণিজ আমিষের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, বাজার ব্যবস্থা জোরদারকরণের লক্ষ্য নিয়ে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। 

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড