সোমবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
০১ মার্চ ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

শেকড়ের টান মানে নিজ ভাষা-সংস্কৃতির টান

শামীম  আজাদ: ভদ্রলোক বিলেতে থাকতেন তখন। ইতোমধ্যে পরিবারের সবাই তার অনুগ্রহে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। এখন জানি না তিনি কোথায় আছেন।  তাঁর বয়স তখন ৫৫ বছর।  স্ত্রী বাংলাভাষী নন।  বিত্ত বিলিয়ে দেবার জায়গা খুঁজতে একদিন লম্বা ওভার কোট গায়ে ও লাল কাশ্মীরের স্কার্ফ গলায় আমার দ্বারে এসে হাজির! আমরা তখন পার্থ রোডে ছিলাম। 

ইংরেজীতেই আমাদের কথোপকথন হত। তাকে চোখে না দেখলে শুধু কথা শুনলে মনে হবে কোন ককেশিয়ানের কথা শুনছেন। আর চা’য়ে, খাবারে, বিহারে এমন বিনমিত থাকতেন যেন মনে হতো তিনি কোনো বনেদী ইংরেজ মধ্যবিত্ত সন্তান। যতক্ষণ আমার পরিবারের সংগে থাকতেন আমাদের সংগে অনবরত কথা বলতেন। তার পোশাক থেকে অচেনা দামী সুগন্ধ আসতো। ভাত ডালের সংগে আস্ত কাঁচা মরিচ কাঁটা দিয়ে কিভাবে যেন থেঁতো করে হু হা করে খেতেন।

কিন্তু গল্পটার বিষয়বস্তুটিকে একসময় বাংলাদেশের দুরবস্থা ও বাংলা ভাষা বলতে পারাটা যে কত জরুরি সে বিষয়ে নিয়ে যেতেন। এক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য এখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী বিষয়ে নিরিক্ষা শুরু করতে চাইলে আমার পাশে এসে দাঁড়ান।

সেটা আজ থেকে বছর দশ আগের ঘটনা।  এক সামারে আমি আমার ছোট্ট লাল টয়োটা ড্রাইভ করে কেন্দ্রের একজন তরুণ, একজন তরুণীকে এবং এক স্যুটকেস বাংলা বই, সিডি ইত্যাদি নিয়ে  টাওয়ার হ্যামলেটস এর গাছ তলা, কমিউনিটি সেন্টারের পাশে মাঠতলা ইত্যাদিতে বসা শুরু করেছিলাম। ছেলেমেয়ে দু’টো পঁচিশ পাউন্ড করে পেত। আমি পঁচিশ পাউন্ড নিতাম গাড়ির তেলের জন্য। আর তিনজন মিলে পঁচিশ পাউন্ডে খাবার, চা ইত্যাদি খেতাম। সপ্তাহের ওই ১০০ পাউন্ড তিনি দিতেন। নারীরা ১ পাউন্ড জমা দিয়ে একটি বই ধার করতেন। বাংলা বই বাংলা নাটক বা বাংলা গান। কেন্দ্রের ছেলেমেয়ে দু’টো বইপত্র কাপড়ে বিছিয়ে বসতো আর রেজিস্ট্রি করতো মেম্বারশিপ। পাতলা একটা খাতা ধরিয়ে বুঝিয়ে বলতো কীভাবে এক লাইন হলেও বইটি সম্পর্কে লিখে নির্ধারিত দিনে ফিরিয়ে আনবেন। ওই অতটুকু টাকা নিয়েই আমরা পাইলট স্কিম বা পরীক্ষা করলাম। সেটা সফলও হল।

কিন্তু কথা এই প্রকল্প না। কথা হচ্ছে প্রকল্পে অর্থায়ন করা ব্যক্তিকে নিয়ে। তিনি লন্ডন থেকে বহুদূরে কোনো এক  সবুজ টিলার উপর সুরম্য এক দ্বিতল বাড়িতে পরিচারিকার বানানো কফি নিয়ে আমার ফোন এর অপেক্ষা করতেন। প্রতি সপ্তাহে আমার কাছ থেকে অতি মনযোগ দিয়ে রিপোর্ট নিতেন। আমি বুঝতাম তিনি আসলে গল্পটাই শুনতে চান। বাংলা বইগুলোর গল্প ও যে মায়েরা আসেন তারা কে কী বললেন। তারা কী তাদের শিশুর সংগে বাংলা বলেন। এ ধরনের গল্প। একেক বার একেক রকম গল্প শুনতে শুনতে বলতেন, ছোট বেলা নিজের শিকড়ের গল্পটা জানা বড় জরুরি।

কারণটা বুঝেছিলাম পাঁচ বছর পর। সেদিন কভেন্ট গার্ডেনে পোয়েট্রি ক্যাফেতে আমার কবিতা শুনতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে আজাদও। কবিতাটা ইংরেজীতে লেখা। তার মধ্যে একটা বা দু'টো বাংলা শব্দও ছিলো। বিষয়বস্তু ছিলো ঝড়, বাংলাদেশের ঝড়। ফেরার পথে পাতাল রেলে সামনা সামনিই বসেছিলেন। ট্রেন চলছে হুহু করে। ভাল করে কথাও বলা যায় না। শীতের রাত, আমি এমনভাবে মাথা মুড়েছিলাম যে তিনি আমাকে কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছিলাম না। কানের উপর থেকে স্কার্ফ সরিয়ে তাঁর পাশে গিয়ে বসার পর আফসোস করেছিলেন তাঁর নিজের অভিভাবকদের নিয়ে। নিজেরা বাংলা বললেও বিলেতের মূলধারায় মিশে রুটি রুজি করার জন্য তাদের সংগে বাংলায় কথা বলেন নাই। অত ভাল ইংরেজী না পারলেও বাবা-মা তিন ভাইবোনের সংগে বাংলা বলেন নাই। বাংলাদেশ যে কত অগম্য একটা জায়গা তা তিনি ছোটবেলা থেকে জেনে বড় হয়েছেন। দেশের নানান গল্প তিনি আমার কাছ থেকে খুব মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। একদিন মন খারাপ করে বলেই ফেল্লেন, ‘মাই পেরেন্টস ডিড’নট ডু দা রাইট থিং।’

আমি তাই বলি নিজ জাতি বা সন্তানদের শিশুকাল থেকেই খাওয়া-দাওয়া ও পড়াশোনার সংগে নিজ সংস্কৃতি, রুচি এমনকি দেশপ্রেমটাও ধর্মজ্ঞানে গুরুত্ব দিয়ে শেখাতে হবে। নিজ সন্তানের উপলব্ধির দ্বার খোলা থাকবে তবেই। দেশকে ঘিরে নিজ সততা ভালোবাসা নিজের মায়ের মতই মাথায় থাকবে। না হলে একদিন তারা যখন বড় হবে তখন তা হারিয়ে চরম বঞ্চনায় পাগল হয়ে উঠবে। ধনে মানে বড় হলেও নিজেকে হত দরিদ্র মনে হবে এবং তখন যে সে তার বাবা- মা’কে দায়ী করবে না তা কে বলতে পারে? পারে না।

আমি তা বহু প্রত্যক্ষ করেছি এমনকি বাংলাদেশেও! বাংলাদেশে এর প্রতিচ্ছবি একটু ভিন্ন। সেখানে কিছু কিছু পরিবারের ছেলেমেয়েরা খাবার টেবিলের আলোচনায় বাংলাদেশ যে কত খারাপ বিভিন্ন আঙ্গিকে রসিয়ে রসিয়ে বলা এমন গল্প শুনে বড় হয়। আরে ভাই খারাপ কার নেই? কিন্তু ভাল তো কিছু আছে নাকি? সেই কিছুটাই না হয় বলুন। সব না বলুন, পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে লিখিত, স্বীকৃত ও চিহ্নিত সেই একটি গল্পই না হয় তাদের শুনিয়ে বড় হতে সাহায্য করুন। মুক্তিযুদ্ধ কি ও কেন হয়েছিলো নিদেন পক্ষে শুধু তাই বলুন। আর বাংলায় কথা বলুন।

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড