সোমবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
০১ মার্চ ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

আমি এখন চিনি এই শহরটা, এই শহরের মানুষদের

মহুয়া ভট্টাচার্য : বছর দেড় বছর আগের এক দুপুরে স্বামীর মারের ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। হ্যাঁ আমিই। এই মহুয়া ভট্টাচার্য, যে একটু ছুঁতো পেলেই কথায় পিষে মারি পুরুষদের, পোস্টে সাড়ে সাত হাত বাঁশ দিতে ছাড়ি না। আমি আমার স্বামীকে ভয় পাই। এখনো, ভীষণ। তিনি একটি আতংকের নাম আমার কাছে। এক কাপড়ে শূন্য হাতে সি এন জিতে উঠে চলে গিয়েছিলাম আকতারী আপার বাসায়। নেমে সি এন জি ভাড়াও দিয়েছি তাঁর কাছ থেকে নিয়ে।  একটা চাকরি পাবার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি দ্বারেদ্বারে। যার কাছেই বলতাম, সেই বলত আপনার তো অনেক পরিচিত!  তাঁদের বলুন না! শেষে চাকরি মিলল। যিনি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন, তিনি এই সমাজের চোখে সুশীল, প্রগতিশীল ইত্যাদি ইত্যাদি নামে আপনারা যাঁদের অবিহিত করেন তাদের কেউ নন। তাঁর কথা আলাদা করে বলবো একদিন। 

চাকরির ইন্টারভ্যিউতে কেউ আমাকে পছন্দ করেননি। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া নেই আমার, তার ওপর যেদিন  সাক্ষাতকার দিতে গেলাম, সেদিন আমার মুখের বামদিকে কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত কুচকুচে কালো হয়ে আছে আমার স্বামীর শাসনের নমুনায়। রিসেপশনে এমন ত্রুটিপূর্ণ মুখ গ্রহণযোগ্য না। কিন্তু আমার তো চাকুরি দরকার, ভীষণ দরকার একটি চাকুরী। আমার কম্পিউটার জানা নেই,  দেখতে ভালো নোই এসব দায় নিয়েও চাকুরীর জন্য হত্যে দিয়ে পড়েছিলাম। সেই রাতগুলোতে ঘুম ভেঙে দেখতাম আকতারী আপা আমার মুখে ক্রিম লাগিয়ে দিচ্ছেন। আমার মুখের দাগ যেনো ঢেকে যায়, সেই আশায়! বাইরে যাবার সময় নিজের কাপড় পড়িয়ে সাজিয়ে দিতেন যেন কোথাও আমাকে দূর্বল মনে না করে কেউ। অনেক অনুরোধ, অনুনয়ের পর কম্পিউটার পরীক্ষা এবং  নিজের নানা দক্ষতার প্রমান দিয়েও আমি যে ছয় হাজার টাকা বেতনের চাকরী পেতে হন্যে হয়েছি, এখন দেখি একই পোস্টে নিজের নামটি অব্দি ভালো করে লিখতে জানে না, এমন মানুষও চাকুরী করে ভাত খাচ্ছে!  যাই হোক, সেই কথাও আরেকদিন বলবো। 

চাকুরী পাবার অনিশ্চয়তার সময় ভাবলাম, আকতারী আপার বাসা অনেক দূর। এতো টাকা গাড়িভাড়া দিয়ে রোজ জামালখানে আসা সম্ভব নয়, তাই কাছেপিঠেই একটি থাকার জায়গা হলে আমার সুবিধে হোতো।  যার নিজের চলার মত টাকা নেই, খাওয়ার টাকা নেই সেই মানুষ আমি কি করে কারো কাছে থাকার জায়গা খুঁজতে যাবো!? শহরের একজন নামকরা ডাক্তার দম্পতি আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সে সময়  তাদের অন্য আরেকটি ফ্ল্যাটে, সাথে সঙ্গী পেলাম দুটি দেবশিশু। পরম যত্মে, মায়ায়, ভালোবাসায় তাঁরা আমায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে আমার একজীবনের ঋণ। আমাকে না খাইয়ে তাঁরা কখনো খেতে বসতেন না। পাশেই আর একটি ফ্ল্যাটে তাঁরা থাকতেন, খাবার সময় হলেই আমাকে ডাকতে চলে আসতেন। তাঁদের সাথে জীবনের কিছু অসাধারণ সময় আমি কাটিয়েছি। কিন্তু আমার নিজের ভেতর খুব সংকোচ বোধ হোতো,আমার নিজেরই সামর্থহীনতার জন্য। প্রতিবেলায় খেতে বসতে ভীষণ লজ্জা হোতো,তাই একটা বুদ্ধি করতে হোলো। তাঁরা খেতে ডাকলে প্রায়ই বলতাম-  বাইরে প্রচুর খেয়ে এসেছি। ব্যাগে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট রাখতাম। আমার বহু আত্মীয়, চেনা পরিচিত ফোন করতো তখন। তারা কেউ আমি কেমন আছি জানতে চাইতো না। জানতে চাইতো আমি কোথায়, কার সাথে আছি। সেসময় আমাকে নিয়ে এই পুরো চট্টগ্রামে চেনা মহলের সবার মধ্যে একটি কথা চাউর হয়ে গেলো। আমি মুসলমান হয়ে গেছি! কোন এক মুসলমানকে বিয়ে করেছি! এই সাহিত্য জগতেরই অনেক দু'মুখে সাপও তাতে ঘি ঢেলেছিলো। এখনো আমাকে নিয়ে দুটি দল। একদল তাদের আড্ডা আলোচনায় বলেন - আমি মুসলমান হয়ে গেছি। অন্যদল বলেন আমি সাম্প্রদায়িক। আমার পক্ষে বিপক্ষে সমস্ত কথাই আমি খুব উপভোগ করি। আমার ভালো লাগে। আমার নিজের সমালোচনা গ্রহণ করার মত সামান্য ক্ষমতা আমার তৈরি হয়েছে। আমি এখন আমার সেই ক্ষমতার ইমপ্রোভাইজেশন চালিয়ে যাচ্ছি। 

তো এই লেখা আসলে তাদের জন্য,  যাঁরা বলেন আমি আমার কাটকাট পোস্টের জন্য  জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি, মানুষের অপ্রিয় হয়ে যাচ্ছি। এই কথা একবছর আগে বললেও আমি খুব দুঃশ্চিন্তা করতাম। এখন হয় না ভাই। এখন আমি চাকরী হারালে পান ব্রি বেঁচে নিজের পেট চালানোর মত মনের সাহস আছে। মাথার ওপর ছাদ টিকিয়ে রাখতে শেষ অবধি লড়াই করার শক্তি আছে। আমি এখন চিনি এই শহরটা, এই শহরের মানুষদের। আমার এই শরীর এখন ঝড়, তাপ, শৈত্য - সমস্ত কিছুর সাথে লড়াই করতে পারবে। কষ্ট হবে, তবে পারবে।

আমার জীবনে অনেক অনেক জটিলতা আছে, কিন্তু কোন গোপনীয়তা নেই। জনবিচ্ছিন্নতা শব্দে আপনারা যে জনগণের কথা আমাকে বলেন সেই জনগণদের আমি এখন খুব ভালো জানি। তাই সেই বিচ্ছিন্নতা নিয়ে দুঃখ লাগে না আর। 

শুধু ভালোবাসার পাবার লোভ কাটাতে পারিনা কিছুতেই। জীবনে নির্মোহ হবার চেষ্টা করে করেও এই লোভের কাছে হার মেনে আছি প্রতি পলে পলে। আমি অকৃতি অধম জেনেও যাঁরা ভালোবেসেছেন তাঁরাই সেই লোভ বাড়িয়ে দিচ্ছেন অহর্নিশ।

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড