রবিবার, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭
০৭ মার্চ ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

রক্ত দিয়ে কেনা

নাটিকা লেখক : মো. আরিফুল হাসান

[বিজয়পুর হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। মঞ্চের ডান পাশে হাত মুখ বাধা অবস্থায় পড়ে আছে তিনজন বন্দী। এদের একজন মেয়ে নাম তার জমিলা আর অন্য দুজন পুরুষ, নাম যথাক্রমে আব্দুল ও শহিদুল। একটি চেয়ারে বসে আছে ক্যাপ্টেন বুখারি। তার হাতে একটি রিভলবার। তার বাম পাশে দাড়িয়ে আছে একজন পাকিস্তানি সৈনিক। ক্যাপ্টেন হুংকার ছেড়ে বলে-

ক্যাপ্টেন : লেরকিকো মুখ খুল দো
সৈনিক : ইয়েস সার

[সৈনিক এগিয়ে যেতে থাকে বন্দি মেয়েটির দিকে। ক্যাপ্টেন আবার ডাকে-]

ক্যাপ্টেন : আর ছোনো, লেরকিকো হাত নেহি খুুলো। ইয়ে লেরকি বহৎ বান্দর হে।
সৈনিক : ইয়েস স্যার

[সৈনিকটি এগিয়ে যায় বন্দি মেয়েটির দিকে। হাত পিছমোড়া করে বেধে রাখা হয়েছে। পুরো মুখ বেধে রাখা হয়েছে কালো কাপড় দিয়ে। মেয়েটি হাতের বাধন খোলার জন্য মোচড়াতে থাকে। সৈনিকটি গিয়ে মেয়েটির মুখের কাপড়টি সরায়।]

সৈনিক : স্যার, ইয়ে তো হুর পরি হে
ক্যাপ্টেন : খামুস। প্যাহলে হামি দেখি। দুছরা তুম দেখো।
সৈনিক : (লজ্জিত মুখে) ইয়েস স্যার
ক্যাপ্টেন : আর ছোনো, বাদবাকি বন্দিকো চোখ বান্দি লেও। আর তুম একটু ওধার যাও। মে ফুর্তি কারে গা।
সৈনিক : ইয়েস স্যার

[সৈনিক বাকি দুজন বন্দির চোখ বেধে মঞ্চ ত্যাগ করে। ক্যাপ্টেন চেয়ার থেকে উঠে। শাহাদত আঙ্গুলিতে রিভালভারটাকে ঘুরায়। ঘুরাতে ঘুরাতে মেয়েটির দিকে কয়েক পা এগোয়। আবার থামে। থেমে দর্শকদের দিকে মুুখ করে বলে।]

ক্যাপ্টেন : হা হা  হা.....। পাকিস্তান। পাকিস্তান মেরা দেশ হে। জেনারেল ইয়াহিয়া, মেরা নেতা হে।

[তারপর আবার এগোয় মেয়েটির দিকে। দুয়েক পা গিয়ে আবার সে থামে। দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে-]

ক্যাপ্টেন : পাকিস্তান......পাকিস্তান, পাকিস্তান জিন্দাবাদ

[বুটের খট খট শব্দ করে ক্যাপ্টেন এগিয়ে যায় বন্দি জমিলার দিকে। জমিলা দু হাঁটুতে ভর দিয়ে মুখটা নিচু করে বসে আছে। 
ক্যাপ্টেন নুয়ে মুখ দেখে জমিলার।]

ক্যাপ্টেন : বাহঃ বহৎ খুব ছুরত হে, বহৎ খুব ছুরত হে
জমিলা : আমাকে ছেড়ে দে শয়তান
ক্যাপ্টেন : নেহি, কাভি নেই
জমিলা : শয়তান শূয়োরের বাচ্চা, তোদের দিন আর বেশি নেই। চারিদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ধেয়ে আসছে। শুনতে পাচ্ছিস না, মিত্রবাহিনী 
        আকাশপথে বোমা মারছে ক্যান্টনমেন্টে। এবার তোদের লেজ গোটানোর সময় এসেছে শয়তান।
ক্যাপ্টেন : হা হা হা.............নেহি কাভি নেহি
জমিলা : শেষ হাসিটা হেসে নে শয়তান। তোদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ বাঙালি বুক পেতে দিয়েছে অস্ত্রের মুখে। 
        তোদের অত্যাচারের মুখে জীবন দিয়েছে লাখ লাখ অবলা নারী। আর তোদের রক্ষা নেই। এবার মৃত্যুর জন্য তৈরি হ, শয়তান।
ক্যাপ্টেন : ইতনা রৌশন মাত দেখো সুন্দরী। লেহাজা মে আপসে পেয়ার কারো গা।

[ক্যাপ্টেন ঝুঁকে জমিলার মুখ দেখে। হাত দিয়ে জমিলার মুখ উঁচু করে ধরে। কামুক লোভাতুর চোখে দেখে। তারপর বলে-]

ক্যাপ্টেন : পেয়ার কারেগা।

[জমিলা থুঃ করে একদলা থুথু ছিটিয়ে দেয় ক্যাপ্টেনের চোখে মুখে। ক্যাপ্টেন ক্রদ্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠে]

ক্যাপ্টেন : হেহ!

[সোজা হয়ে ক্যাপ্টেন হাতের তালোয়  চোখ মুখ মুছে। এমন সময় শেয়ালের মতো এদিক সেদিক চেয়ে চেয়ে সেখানে প্রবেশ করে রাজাকার বাতেন ও তার চামচা মোল্লা কাদের।]

বাতেন : সালাম হুজুর।
কাদের : হুজুর মা বাপ
ক্যাপ্টেন : কিয়া আওয়া কিয়া? আপকি পাস সানিকা বাত নাহি থা?
বাতেন : হুজুর ভয়ানক সর্বনাশ হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা বড়বাজার দখল কইরা নিছে। 
কাদের : মনে হয় কিছুক্ষণের মইধ্যেই এই ক্যাম্পে হামলা দিবো।
বাতেন : (লাফিয়ে গিয়ে ক্যাপ্টেনের পায়ে ধরে) হুজুর আমারে বাচান।
কাদের : (ক্যাপ্টেনের পায়ে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়বে) হুজুর আমারে বাচান।

[ক্যাপ্টেন ঝাড়া দিয়ে পা ছাড়িয়ে নেয়। মঞ্চে অন্য দুজন পুরুষ বন্দির দিকে এগিয়ে যায়। বুট দিয়ে লাত্থি দিয়ে ফেলে দেয় এক জনকে। তারপর বলে]

ক্যাপ্টেন : শালা হারামজাদা, বাংলাদেশ বানবি? কে আব বাংলাদেশ বানাতে হে? মে আজ তোমহি খাতাম কারোগা।

[ক্যাপ্টেন হাতের রিভলভারটা তাক করে মাটিতে পড়ে থাকা বন্দিটির দিকে। ট্রিগার টানে। গুলির আওয়াজ হয়। বন্দির দেহটি একটি কাল চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে তড়পাতে থাকে। জমিলা চিৎকার করে উঠে]

জমিলা : না..............
ক্যাপ্টেন : মে আপসে পেয়ার কারো গা, সুন্দরি।
জমিলা : হারামজাদা, এই পাপের ফল তোরা পাবি। নিরিহ বাঙালির উপর এই নির্মম অত্যাচারের প্রতিফল তোরা পাবি। মুক্তিযোদ্ধারা তোদের 
        ছাড়বে না। তোদের প্রত্যেককে গেঁথে দেবে এই মাটির বুকে। এই মাটি ও মায়ের সাহসী সন্তানেরা, তোদের প্রত্যেককে খতম করবে। 
        বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। স্বাধীন হবে বাংলাদেশ

[রাজাকার বাতেন এগিয়ে আসবে জমিলার দিকে।]

বাতেন : এই চুপ, চুপ। বেয়াদব মাইয়া, হুজুরের মুখের উপ্রে কথা!
জমিলা : তোদের হুজুরের মুখে থুথুও দিয়েছি রাজাকার। তোদের হুজুরকে আমি ভয় পাই না।
বাতেন : হায় হায়! কী সর্বনাশ! পাক সৈনিকের মুখে থুথু দিছস? কামডা করছস কী?

[মোল্লা কাদের এগিয়ে আসে। জমিলার দিকে একবার চায়। তারপর দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলে।]

কাদের : পাক সৈনিক। তারা হইলো পাক সৈনিক। পাক দেশের লাইগ্যা যুদ্ধ করে। আর বাঙালি হইলো নাপাক জাতি। তারা হিন্দুদের সাথে 
        মিল্লা, পাক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আমরা পাক দেশের পক্ষে আছি। সবাই আমাদেরকে রাজাকার কয়। কউক। পাক দেশের 
        লাইগ্যা আমরা জীবন দিয়া দিমু।
জমিলা : তোদের সময়ও শেষ হয়ে এসেছে হে চামচার দল। তোদের দিনও ফুরিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা আসছে বিজয়ের পতাকা নিয়ে। ঐ তো 
         আসছে, ঐ তো আসছে.....
বাতেন : আসবে না।
কাদের : আসবে না। আসবে না।
বাতেন : আর আসলেই বা কী? আমাদের ক্যাপ্টেন তার পিস্তল দিয়া সবাইরে মাইরা ফালাইবো।
কাদের : হ, মাইরা ফালাইবো।
জমিলা : মৃত্যুকে ভয় পায় না বাঙালিরা। দেখিসনি কেমন বুক পেতে দিয়েছে বায়ান্নোতে? দেখছিস না কি করে একটু আগে, এইখানেই মৃত্যুর 
        মুখে ঢলে পড়লো আরেক বাঙালির লাশ? বাঙালিরা মরতে জানে। তাই কেউ ওদের দমাতে পারবে না।
কাদের : ওঁওঁওঁ! যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! আমাদেরকে ভয় দেখায়! আমাদেরকে ভয় দেখায়।

[রাজাকার কাদের এগিয়ে যায় অপর বন্দ

রাজাকার কাদের এগিয়ে যায় অপর বন্দি পুরুষটির দিকে। পা দিয়ে লাত্থি দেয় তার পিঠে। নাকে মুখে চর মারে। মাথাটা গুজে দেয় মেঝেতে। তারপর বলে]

কাদের : ওঁওঁওঁ! শখ কতো! দেশের জন্য যুদ্ধ করবে! বাংলাদেশ স্বাধীন করবে! যতসব নাফরমানের দল।
জমিলা : (জমিলা চিৎকার করে উঠে) নাফরমান আমরা নই শয়তান। আমরা তো দেশের জন্য যুদ্ধ করছি। দেশের জন্য জীবন দেবো। আর 
         তোরা? তোরা দালালি করছিস কাদের জন্য? যারা দেশের শত্রু, দশের শত্রু, তোরা তাদের সাথে হাত মিলিয়েছিস? নিজের দেশের 
         সাথে বেইমানি করেছিস? এই বেইমানির প্রতিফল তোরা পাবি।

[খেকিয়ে ওঠে বাতেন]

বাতেন : প্রতিফল! হ্যাহ! আমাদের আবার প্রতিফল কী? আমরা তো পাক দেশের লাইগ্যা যুদ্ধ করি। পাক দেশের সৈনিকদেরকে সাহায্য
        সহযোগিতা করি। আমাদের তো ফলাফল হইবো বেহেস্ত। জান্নাতুল ফেরদাউস।
জমিলা : হুহ! বেহেস্ত! তোদের তো নরকেও জায়গা হবে না পাপিষ্টের দল। তোরা জাহান্নামি। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙালিরা ঘৃণার সাথে 
        স্মরণ করবে তোদের। তোদের নামের পাশে লেখা থাকবে কলঙ্কের ইতিহাস।
কাদের : (দৌড়ে এসে) খামুশ বেয়াদব মাইয়া। (ক্যাপ্টেনের হাত থেকে রিভলবার টেনে এনে জমিলার কপালে ধরে।) খামুশ হারামজাদি 
         মাইয়া। একদম কথা কইবি না। গুলি কইরা মাথার খুলি ডুল্লা কইরা দিমু।
জমিলা : (জমিলা মুখ ঝামটা দিয়ে) হুহ! তোদের গুলিকে ভয় পাই না চামচার দল। এই দেশ, এই মাতৃভুমির জন্যে, কতো মায়ের বুকই তো 
        খালি হয়েছে। আরও একটা লাশ না হয় পড়বে। তবুও বলবো, বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই।
কাদের : স্বাধীন! নাহ? সেই আশা তোদের কখনোই পূরণ হবে না মেয়ে। দেখ, দেখ তোদের স্বাধীনতা দেখতে কেমুন!

[কাদের রিভালভারটা উঁচিয়ে এগিয়ে যায় অপর বন্দির দিকে। পা দিয়ে এলোপাথারি লাত্থি মারে। রিভালবার দিয়ে আঘাত করে বন্দির মুখে। বন্দি মাটিতে পড়ে যায়। রিভালভার তাক করে কাদের। এমন সময় নেপথ্যে ¯েøাগান বাজতে থাকে।]

নেপথ্যে : জয় বাংলা : জয় বঙ্গবন্ধু। তোমার আমার ঠিকানা : পদ্মা মেঘনা যমুনা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো : বাংলাদেশ স্বাধীন করো

[নেপথ্যের মিছিলটি নিয়ে একদল মুক্তিযোদ্ধা গুলি চালাতে চালাতে মঞ্চে প্রবেশ করে। মঞ্চে ক্যাপ্টেন, কাদের ও বাতেন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। একপর্যায়ে ঢলে পড়ে ক্যাপ্টেনের লাশ। চিৎকার চেচামেচিতে নরক কাÐ মঞ্চে। মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার বাতেন আর মোল্লা কাদেরকে বেধে ফেলে। জমিলা ও অপর জীবিত বন্দির বাধন খুলে দেয়। মৃত বন্দির লাশটিকে ধরাধরি করে এনে মঞ্চের সামনের দিকে শুয়ায়। একজন মুক্তিযোদ্ধা তার মাথায় বাঁধা পতাকা দিয়ে লাশটিকে ঢেকে দেয়। সবার চোখে অশ্রæ। নেপথ্যে করুণ সুর বাজতে থাকে। তারপর বাজতে থাকে পূর্ব দিগন্তে, সূর্য ওঠেছে, রক্তলাল, রক্তলাল, রক্তলাল....]