বৃহস্পতিবার, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭
০৪ মার্চ ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

প্রবাসে বিজয়ের চেতনা

আমিনা তাবাস্সুম : আমরা বাংলাদেশের মানুষ, এক স্বাধীন দেশের মানুষ। এই স্বাধীন দেশের গর্বে বুক ফুলিয়ে আমাদের প্রবাসে বসবাস। সচেতন ভাবেই হোক আর অবচেতন ভাবেই হোক, আমাদের প্রবাস জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটে আমাদের ফেলে আসা দেশের স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে। আর সে কারণেই দেশের প্রতিটা পালা-পার্বন আমরা নিষ্ঠার সাথে পালন করি। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে চর্চা করি দেশীয় সংস্কৃতির, কৃষ্টির এবং ঐতিহ্যের। এসবের মাধ্যমে প্রবাসের মাটিতে সুপরিচিত করে তোলার চেষ্টা করি আমাদের প্রিয় দেশকে। আর তার সাথে চেষ্টা করি দেশের প্রতি আমাদের এই ভালোবাসা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দিতে। যাতে করে আমাদের নিজেদের জীবনের সাথে সাথে হারিয়ে না যায় আমাদের দেশ। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে আমরা যেন জ্বালিয়ে রাখতে পারি আমাদের ভালোবাসার মশাল, আমাদের ভাষা, আমাদের ঐতিহ্য আর আমাদের সংস্কৃতি এই বিদেশের বুকে। আর সর্বোপরি রেখে যেতে পারি আমাদের স্বাধীন দেশের ইতিহাস, যা আমাদের গর্ব।  

আমরা প্রবাসীরা যে দেশেই থাকিনা না কেন, দেশ নিয়ে আমাদের এই মানসিকতা, চিন্তাধারা আর আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন রূপে প্রতিবছর বিজয় দিবস পালন করা হয় মহা জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে। দেশের প্রতি সবটুকু ভালোবাসা, মায়া-মমতা নিংড়ে দিয়ে মেতে উঠি বিজয়ের উৎসবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, স্মৃতিরোমন্থন হয়, সন্তানদের দেশের ইতিহাস গর্বভরে শুনানো হয়, ঘরে ঘরে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা যেন এসময় কিছুটা বেড়েই যায়। আর আজকাল সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর বদৌলতে এই বিশেষ দিনগুলো পালনের ব্যাপক প্রচার এবং প্রসার ঘটেছে আর তার সাথে সাথে বেড়েছে আমাদের এই বিজয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবার সুযোগ।

বিজয় দিবসের কথা বলতে গেলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম আর তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জনের প্রতি আলোকপাত করতে হয়। আর বর্তমানের প্রেক্ষাপটে "বিজয় দিবস" নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক বিষয়ই খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। তবে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে আজকের বিজয় দিবসটিকে একটু অন্য আঙ্গিকে উপলব্ধি করতে চাই।

নিজেদের দেশের মানুষ আর পরিবারের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর চেতনা চর্চার সাথে সাথে বিদেশের মাটিতে কীভাবে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করার কাজ করা যায় সেদিকে একটু আলোকপাত করা  প্রয়োজন। শিক্ষা, জ্ঞান - বিজ্ঞান, ব্যবসা- বাণিজ্য, রাজনীতি, খেলা-ধুলা, শিল্পকলা, সংস্কৃতি এধরণের বিভিন্ন অঙ্গনে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করা আর সাফল্য অর্জন করার মাধ্যমে দেশকে সারা বিশ্বে সুপরিচিত করা সম্ভব। কিন্তু এছাড়াও প্রবাসে বাংলাদেশিরা নিজ গুণাবলী আর নিজ কর্ম দ্বারা যে কোনো ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মাধ্যমে সহজেই বাংলাদেশকে বিদেশের কাছে এক সম্মানের দেশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। ব্যাপারটা আসলে খুব একটা জটিল না। মানুষ খুব সহজে প্রভাবিত হয় অপরের চরিত্রের ভালো-মন্দ দ্বারা। আর বেশিরভাগ মানুষই কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা ধর্মের মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র এবং কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়েই সেই দেশ, জাতি বা ধর্ম সম্পর্কে ধারণা লাভ করে থাকে। আর প্রত্যেকে যদি যার যার অবস্থানে থেকে ভালো কাজ এবং সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে তার আশেপাশের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলেই কিন্তু তারা অপরের কাছে দেশের সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সফল হবে।

আর তাই একজন প্রবাসী বাংলাদেশির নিজ চরিত্র আর কর্মকান্ডের প্রতি যত্নশীল হবার বিশেষ প্রয়োজন। কেননা এর মধ্যে দিয়ে শুধু কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে না, এর সাথে বিশ্বের সামনে নিজের দেশকে তুলে ধরা হয়। আমরা প্রবাসীরা অনেক সময়ই দেখা যায় নিজের দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা নিয়ে অনেক মাতামাতি করলেও আমাদের দেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী কিছু সাধারণ গুণাবলীগুলোর চর্চা দেশীয় গণ্ডির বাইরে করে উঠতে পারিনা। এতে করে নিজেদের অজান্তেই আমরা প্রবাসে দেশের যথাযথ  ভাবমূর্তি বজায় রাখতে সক্ষম হইনা।  

বাংলাদেশিরা জাতি হিসেবে ভীষণ আনন্দপ্রিয়, অতিথিপরায়ণ আর পরোপকারী। নিজেদের দেশের শত সমস্যা আর বৈপরীত্যের মাঝেও আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়াতে কার্পণ্য করিনা। বাংলাদেশিরা আবেগী মানুষ হিসেবেও পরিচিত। আমরা একমাত্র জাতি আমাদের ভাষার জন্য আমাদের লড়াই করেছি। আমরা ভীষণ কর্মঠ জাতি। আমাদের অভিবাসী শ্রমিকরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের কাজ এবং নিষ্ঠার কারণে সুনাম কুড়িয়েছে। বাংলাদেশিরা সহনশীলতার মূর্তিমান প্রতীক। শত কষ্ট, বঞ্চনা, দারিদ্রতার মাঝেও আমরা হাসিমুখে জীবন চালনা করতে সক্ষম। সততা, নিষ্ঠা, উদারতা, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, সহনশীলতা বাংলাদেশিদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আমাদের এই দিকগুলোকে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই পৃথিবীর সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হই।  

এই বিজয় দিবসে আমরা আমাদের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য উদযাপনের সাথে সাথে আশাকরি আমাদের মানবিক গুণাবলীর চর্চা করার দিকেও মনোনিবেশ করতে পারবো। আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের ভাষা, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক হিসেবে তৈরি  করার সাথে সাথে তাদের মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতেও বিশেষভাবে উৎসাহিত করতে পারবো। এই মানবিক গুণাবলীও আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। আর সেই গুণাবলী প্রকাশের মধ্য দিয়েই দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার হৃদয় জয় করে বাংলাদেশিদের আসল পরিচয়, আসল চরিত্র পৃথিবীর মাঝে প্রকাশ করতে সক্ষম হবো। তবেই না সার্থক হবে এত কষ্ট আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়।  

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড