রবিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

নারীরাই পারে নারীদের চলার পথ সুগম করতে

উইমেনআই২৪ ডেস্ক : নারীর পরিচয় তুমি নারী, তুমি মমতার ভান্ডারী, তুমি জননী তুমি নারী। নারীর শাশ্বত এ  রূপ আমরা আজীবন ধরেই দেখেছি। নারীও যে রুদ্ররূপ ধারণ করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে। নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে জায়গা করে নিতে পারে তা এখন দেখছে বিশ্ববাসী। 

শোন নারী তুমি চাইলেই পার সব, চোখ বুঝে কেন; কেন মুখ চেপে আঁচলে, তোমরাই ধরণীর বুকে জলতরঙ্গে সুর তাল লয় এনেছ।তোমরা  জগৎকে আলোকিত করো নারী, জ্বলবে আলো জগৎময়। নারী তুমি মূলমন্ত্র ধর, মুখ লুকিয়ে আর নয়। 

নারীরএ রূপ সমাজের সব জায়গাতেই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনই একজন সফল নারী রোকসানা পারভীন। মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যাপক। একাধারে কবি ও সাহিত্যিক।যিনি বালিকাবধূ হয়েও জীবনকে প্রতিষ্ঠা করার পথ থেকে দূরে সরে যাননি। দৃঢ়প্রত্যয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নিজেকে যোগ্য আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ইউমেনআই২৪ ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন। নানা বিষয়ের আলোকে তার জীবনের অজানা কথাগুলো ব্যক্ত  করছেন। আলাপচারিতায় উইমেনআই২৪’র পক্ষ থেকে ছিলেন আবু সালেহ মো. ইউসুফ। আলাপচারিতার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো-

উইমেনআই২৪ ডটকম : কেমন আছেন আপা?

রোকসানা পারভীন : ভালো।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আজকে তো বেগম রোকেয়া দিবস। একজন নারী হিসেবে এ দিবসটির গুরুত্ব আপনার কাছে…..

রোকসানা পারভীন : নারীদের অনেক কথা বলার আছে, অনেক কিছু করার আছে। দেখার আছে জগৎটাকে। কিন্তু নারী এতদিন চোখ বন্ধ করেই ছিল। স্নেহময়ী রূপ ধারণ করিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল নারীকে। নারীর যে আরো কত রূপ আছে তা দিনে দিনে পৃথিবীবাসী দেখছে। বেগম রোকেয়ার হাত ধরেই বাঙ্গালি নারীর চলার পথ সুগম হয়েছে। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : একজন সফল নারী হিসেবে শুরু থেকেই আপনার পারিবারিক জীবন নিয়ে যদি কিছু বলতেন… 

রোকসানা পারভীন : আমি একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। আমাদের বেড়ে উঠাটা খুব চমৎকার ছিলো, খুব বর্ণিল ও স্বপ্নময় ছিল। আমরা ৫১ বর্তী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি।আমাদের পরিবারে আমাদের বাবচাচারা ছয় ভাই ছিলেন। ঈদ উৎসবের মতো আমাদের বাড়িতে উৎসব হতো। আজকে আমি দেখি আমরা যেভাবে বেড়ে ওঠেছিলাম আমাদের সন্তানরা বিচ্ছিন্ন বদ্বীপের মতো। সেই আন্তরিকতা নাই, ভোলোবাসার কোন বন্ধন নাই; সেগুলো থেকে তারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। আমরা ছোটবেলায় প্রজাপতির মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। আমাদেরশৈশব ছিলো আনন্দময়। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : ৬ ভাই-বোনের সবাই কী  লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। 

রোকসানা  পারভীন : সবাই সুযোগ পেয়েছিল। সবাইআজ প্রতিষ্ঠিত, যার যার নিজ নিজ জায়গায়।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনাদের ভাইবোনের এই প্রতিষ্ঠায় কার অবদানকে আপনি স্মরণ করবেন।

রোকসানা পারভীন  : আমার মাকে। মাহচ্ছে সবুজ বৃক্ষ, মা হচ্চে অক্সিজেন; মা ছাড়াতো কোনোভাবে বাচা যায় না। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : এক্ষেত্রে আপনার বাবার কোনো অবদান….

রোকসানা পারভীন : আমি যখন ক্লাশ ফোরে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যান। আমার জীবনের গল্পটা বলতে গেলে এখান থেকেই শুরু।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আচ্ছা..

রোকসানা পারভীন :  আমরা কালচারাল একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। আমার বাবা ছিলেন পূব পাকিস্তান আমলে মোহামেডান স্পেটিং ক্লাবের সেক্রেটারি। সংস্কৃতির সঙ্গে আমরা ওতপৌতভাবে জড়িত ছিলাম। আমরা ছোট বেলায় আনন্দের বহু মাত্রিকতা দেখেছি। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : মেয়ে হিসেবে খেলাধুলা করা বা সাংস্কৃতিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার বিষয়টি আপনার মা কীভাবে দেখতেন…

রোকসানা পারভীন : এমন কোনো বিধিনিষেধ আমাদের সময় ছিলো না। এখন যেরকম ছেলে-মেয়েদের মধ্যে একটা দেয়াল তৈরি করে দেয়া হয় বাচ্চা অবস্থাতেই। আমাদের সময় ছেলে-মেয়ের এমন ধরনের দেয়াল ছিলো না। আমরা ভাইবোন একসঙ্গে খেলেছি। এক সাথে নানা ধরনের খেলায় মেতেছি। আজকের ছেলেমেয়েরা খেলার দিকে যাবেনা। তারা কোনো খেলা জানেনা, একটা দৌঁড় দিতে জানে না। তাদের মাঠ নেই যে তারা ছোটাছুটি করে খেলতে পারে। তাদের মনের আকাশে কোনো আনন্দ নেই। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : তাহলে আপনি ভাগ্যবান এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন..

রোকসানা পারভীন : রবীন্দ্রনাথ বলেছেন আনন্দ ধরা বহিছে ভুবনে আনন্দের ভেলায় চড়ে চড়ে আমাদের দিন কাটতো। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনার শৈশব কেটেছে কোথায়?

রোকসানা পারভীন : আমার শৈশব কেটেছে হাজারীবাগ পার্কের কাছে ২৩ নম্বর বাড্ডানগর লেইনে। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনার পড়াশোনা বিদ্যালয়…

রোকসানা পারভীন : আমি আজিমপুর স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। আমিঢাকার প্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল লিটিল অ্যানজেলস স্কুলে পড়েছি। এটাআজিমপুর কলোনীর ভিতর ছিলো।সেসময়আমি লেবেল টুতে পড়েছি। ওয়ার্ডবুক পড়েছি।

উইমেনআই২৪ডটকম : আপনার খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল, তারপরও আপনি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পেরেছেন সমাজে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করেছেন। এতেকার অবদান ছিলো। 

রোকসানা পারভীন  : এখানে আমার মায়ের খুব অবদান ছিলো। আমার ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। তখন আমি বালিকা বধূ। পারিবারিক একটা অস্থিরতার কারণে এটা হয়েছিল। আর আমার শ্বশুরও আমাদের কিছুটা আত্মীয় হন। তিনি সে সময়তার ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের এমবিবিএস’র মুসলিম ছাত্র ছিলেন। আমার শ্বশুরের প্রতিজ্ঞা ছিল আমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে তার মনের মতো করে তৈরি করার। সত্যিসত্যি তিনি তার কথা রেখেছিলেন। তিনিআমাকে তার মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন। আর সঙ্গে আমার মা ও শাশুড়িরও খুব অবদান ছিলো। সবসময় তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

উইমেনআই২৪ ডটকম : বাবা মারা যাওয়ার পর এতো অল্প বয়সে বিয়ের পাট চুকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন। যথাযথভাবে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। সব ভাইবোন প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এটাএকটা বড় ব্যাপার।

রোকসানা পারভীন : আর একটা বিষয় শাশুড়িও একজন মা। জীবনেরসফলতার জন্য মায়ের ভূমিকা অনেক বেশি।

উইমেনআই২৪ ডটকম : এক নারী আরেকজনের দুঃখটা বুঝে। আপনার শাশুড়ি চেষ্টা করেছেন আপনাকে সেই সুযোগটা দিতে..

রোকসানা পারভীন : নারীরাই পারে নারীদের পথচলা সুগম করতে। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনার বাবা ছোটকালে মারা গিয়েছে তাই হয়তো আপনার মা আপনাকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যতই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বলি না কেন এমন সময় তো আসতেই পারে কারো না কারো জীবনে তাইনা..

রোকসানা  পারভীন : ঠিক। জীবনে এমন কিছু ব্যাপারে চলে আসে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে তা বরণ করে নিতে হয়। বিয়ে হলেই যে একটি মেয়ের জীবন থেমে যেতে হবে এরকম কিন্তু নয়। জীবনটা আপনার। যতই প্রতিবন্ধকতা আসুক তা জয় করতে হবে। জীবনযত চ্যালেঞ্জ হবে সাফল্য তত মধুর ও মজবুত হবে। এই প্রেরণা মেয়েদের ভেতরে জাগিয়ে দিতে হবে। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : জাতি  গঠনে একজন নারী ও মায়ের ভূমিকা কী হতে পারে..

রোকসানা পারভীন : একজন নারীকে আমরা কাণ্ডারি বলতে পারি। নিঃসন্দেহে তিনি হবেন শিক্ষিত নারী। পরিবারকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য, সুশিক্ষিত করার জন্য, মানুষ করার জন্য একজন শিক্ষিত মায়ের বিকল্প নেই। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : বউ যখন লেখাপড়া শিখে বাইরে যায় যে কারণেই যাক না কেন পরিবারের কাজকর্মে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে কিংবা দেখা না দিলও আশেপাশের মানুষের কথাবার্তা থাকে..

রোকসানা পারভীন : সেটা সামলে দিতেন মা। আর সব যুগেই তা হতে হয়। কেননা মায়েরাই পারে আপনাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে।

উইমেনআই২৪ ডটকম :  আপনার স্বামী কি করেন।

রোকসানা পারভীন : তিনিও ভালো মানুষ। তিনিও চাইতেন যে আমি লেখাপড়া করি। সেই সময় উচ্চমাধ্যমিক স্নাতক-স্নাতকোত্তর করেছি। এখনও লেখাপড়া করছি, কখনো তার কাছ থেকে না শব্দটি শুনিনি। আমি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছি।

উইমেনআই২৪ ডটকম : সাংসারিক জীবন পড়াশোনার বিষয়টিকে অনেক কঠোর করে তুলে…

রোকসানা পারভীন : মাঝে মাঝে অনেক কষ্ট লেগেছে। কিন্তু তারপরও আমি মনে করি একজন নারীকে তার নিজের যোগ্যতা দক্ষতা তার শক্তিতে অকুতোভয় সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হবে। যতই ঢেউ আসুক না কেন তরি বেয়ে যেতে হবে।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা জ্ঞান আপনার সন্তান ও ছাত্রছাত্রীদের মাঝে তুলে ধরেন… 

রোকসানা পারভীন : আমি শুধু আমার তিন ছেলেকে নয়, আমার অগণিত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে জ্ঞানবুদ্ধি ভাগাভাগি করি যাতে তারা সুশৃঙ্খল জীবনচলার পথ খুঁজে পায়। কেননা তারাও আমার সন্তান। আমি যা শেখেছি তাদেরকে সে জ্ঞানটা দিয়েছি এবং দেই। তাদেরকে আলোকিত করতে চেষ্টা করেছি ও করি। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপা এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনি শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি করছেন। এ ব্যাপারে যদি কিছু বলতেন…

রোকসানা পারভীন : তার আগে বলি আমাদের সময় দারুন একটা ব্যাপার ছিল আর সেটা হলো বই পড়ার প্রতিযোগিতা। আমরা স্কুলে স্কুলে বই পড়তাম। লাইব্রেরীতে আমাদের অনেক সময় কেটে যেত। বই পড়তে হলে মেম্বার হতে হতো। বইপড়ার জন্য যে কত মার খেয়েছি। কারণ ক্লাশের পড়া ফাঁকি দিয়ে গল্পের বই পড়তাম।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আরও একটি প্রসঙ্গ সামনে এসে গেলো। সেটা হলো আপা এখন কী মনে হচ্ছে না ওই বইগুলি জীবনের জন্য অনেক সহায়ক ছিল…

রোকসানা পারভীন : অনেকভাবে, বই জীবনের অনুভূতিগুলোকে পাল্টে দিয়েছে।

উইমেনআই২৪ ডটকম : আপনি কী নিয়ে লিখেন..

রোকসানা পারভীন : আমি কবিতা-সাহিত্য চর্চা করি। বিশেষ করে শিশু সাহিত্য নিয়ে লিখছি। আমি গল্প নিয়ে কাজ করছি। যেহেতু আমার বিষয় হচ্ছে বাংলা সাহিত্য সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছি। উপন্যাস-গল্প লিখেছি। 

উইমেনআই২৪ ডটকম : সামগ্রিক নারী সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে আপনার প্রচেষ্টা সফল হোক। আপনাকে ধন্যবাদ।

রোকসানা পারভীন : উইমনেআই২৪ ডটকমকেও ধন্যবাদ। সংবাদমাধ্যমে বিশেষ প্লাটফর্ম তৈরি করে নারীদেরকে সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য।

 

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড