রবিবার, ১০ কার্তিক ১৪২৭
২৫ অক্টোবর ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
যুক্ত থাকুন

আর্কাইভ
সর্বশেষ

বাইক নিয়ে নারীদের ছুটে চলা…

বাইক নিয়ে নারীদের ছুটে চলা…

খাদিজা খানম তাহমিনা

বেশ কিছুদিন থেকে ফেইসবুকে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলছে এক কনের গায়ে হলুদের বিরল কিছু ছবি। ছবিতে কনে তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শহরজুড়ে মোটরসাইকেলের র‌্যালি করছেন। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ঘিরে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করেন কনে ফারহানা।

জানা যায় ফারহানা আফরোজ ২০০৭ সাল থেকে তিনি বাইক চালান। এক সাক্ষাৎকারে ফারহানা জানান, ‘আমি যেহেতু বাইক চালাতে পারি; তাই বাইক চালিয়েই গায়ে হলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে এন্ট্রি দেয়ার পরিকল্পনা করেছি।’

নারীদের অফিসে যাওয়ার একমাত্র বাহন বাস। কিন্তু ভিড় ঠেলে সব বাসে উঠা সম্ভব হয় না অনেক সময়। বাসে চলাফেরা নানারকম নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত । তাই এক পর্যায়ে অনেক নারীই সিদ্ধান্ত নেন বাইক কেনার। পরিবারকে বুঝিয়ে রাজি করে মাস খানেক ট্রেনিং নিয়ে পুরোদস্তুর বাইকার হয়ে উঠেন কিছু নারী।

রাস্তায় নারী বাইকারদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ঢাকার রাস্তায় কয়েকবছর আগেও নারী বাইকার দেখাটা ছিল বিরল। এখন দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়েছে। এখন রাস্তায় তাকালেই চোখে পড়ে নারীরা বাইক চালাচ্ছেন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ছে নারী বাইকারদের সংখ্যা।

ইলমা জেবরিন বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়া, বাজার-ঘাট করা, এমন কি অনলাইনে অর্ডার করা পণ্য কাস্টমারের হাতে পৌঁছে দেয়া এসবই সামলান বাইক চালিয়ে । তিনি বলেন, এসব কাজে একটা বাইক অনেকখানি সময় বাঁচিয়ে দেয়। আমিও অনেক সাচ্ছন্দ্যবোধ করি বাইকে। অনেকে মনে করেন, টমবয় টাইপ মেয়েরা নাকি বাইক চালায়, ধারণাটা আসলে ঠিক নয়, আমি পর্দার ভেতরে থেকেই কিন্তু অনায়াসে বাইক চালাচ্ছি, কোনো সমস্যা হচ্ছে না, আমার আশেপাশের মানুষগুলোরও ধারণা পাল্টে দিতে পেরেছি আমি। আসলে এটা আমাদের নারীদের জন্য এখন প্রয়োজন। দিন দিন রাস্তায় বাড়ছে যানবাহন, বাড়ছে যানজট। সেক্ষেত্রে বাইকই একমাত্র স্বস্তি আমার মনে হয়।

রোকসানা ইসলাম নামের আরেক বাইকার জানান, প্রথম দিকে মা রাজি হননি, যদি এক্সিডেন্ট করি, তাহলে তো লাশও খোঁজে পাবে না – এমন সব কথা বলতেন। কিন্তু আমার অদম্য ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখতে পারিনি। আসাদগেটে এক আপু আছেন পরিচিত, তার কাছ থেকে বাইকের প্রশিক্ষণ নিয়েছি, তারপর লিলিতে জয়েন করি। পরে লিলি ছেড়ে জয়েন করি ‘ও বোন’ এ। এমজিএইচ এর কোম্পানি হচ্ছে ও ভাই, এটার অংশ হচ্ছে ‌ওবোন’। এখানে আছি দু’বছর । ভালোই লাগছে। কেমন নিজেকে স্বাধীন স্বাধীন লাগে। কাজটাকে আমি এনজয় করছি আবার আয়ও করছি। আয় কিন্তু খারাপ না, মাস শেষে পঁচিশ হাজার টাকা, বেশ চলে যায় আমার। এখন মা-বাবাও খুব গর্ব করেন আমাকে নিয়ে। একটা সময় আশেপাশের মানুষের নানা কথার যন্ত্রণা সহ্য করেছি, এখন কিন্তু তারাই আমার প্রশংসা করেন। প্রয়োজনে আমি অনেককে সাহায্য করতে পারছি।

নারীদের কথা মাথায় রেখে ‘ওবোন’ নামে একটি সেবা চালু হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্যই ‘ওভাই’-এর বিশেষায়িত সেবা ‘ওবোন’। ‘ওভাই’ অ্যাপের অন্তর্ভুক্ত ‘ওবোন’ অ্যাপ দিয়ে যেকোনো নারী যাত্রী আরেকজন নারী বাইকারের সেবা নিতে পারছেন।

এখন পর্যন্ত ২০ জনের অধিক নারী রাইডার ‘ওবোন’ রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছেন। তারা প্রতিনিয়ত ঢাকার রাস্তায় নারী যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। এ ছাড়া, ৫০ জনের বেশি নারী ইতোমধ্যে ‘ওবোন’ সেবা নিবন্ধন করেছেন এবং তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন বলে সংস্থা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়। আগামীতে সেবার মান আরো উন্নত করতে হবে বলেও তারা জানান । নারীরা যেন এ সেবাটি আরো সহজে পেতে পারে তা নিয়েও কাজ করছেন তারা। নারী রাইডার ও নারী যাত্রীদের ক্ষমতায়ন করাই সংস্থাটির লক্ষ্য। নারী রাইডারদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে তাদের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন তারা। নারীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী রাইডারদের আয় নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিত করছে বলে জানান ওবোন এর রাইডার রোকসানা।

রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে যাতায়াত করেন বাড্ডার রোকসানা। বেশির ভাগ পুরুষ রাইডার বেপরোয়া বাইক চালান। সে দিক থেকে নারী রাইডারদের পেছনে বসা তুলনামূলক নিরাপদ, নারীরা নারীদের সাথে বসে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রতিবন্ধকতার প্রশ্নে রোকসানা বলেন, কিছুটা তো হয়ই তবে এসবে আমরা ঘাবড়ে যাই না, কারণ বাইক রাইডার হওয়ার সাথে আমাদের সাহসটাও অনেক বেড়ে যায়। একবার একজন একটা মেয়ের আইডি থেকে আমাকে ডাকলেন, গিয়ে দেখি একজন ছেলে। আমি বললাম, ভাই এটা তো নারীদের জন্য তখন সে রিকুয়েষ্ট করে তাকে পৌঁছে দিতে।

বাইকার সাঈদা তানজিম বলেন , ‘আমি যখন প্রথম স্কুটি চালাতে শুরু করলাম তখন আশেপাশে অনেকে অনেক কথা বলত। একজন তো মুখের উপর আমাকে দেখে বলেছিলেন, “মাইয়া মানুষ হোন্ডা চালায় না, এটা ব্যাটাদের কাজ।” এখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে, তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে মেয়েরাও বাইক চালাতে পারে।

বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে , ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে ২২,৭৩৩ জন নারী। এতেই বোঝা যায় সড়কগুলোতে নারী বাইকারদের সংখ্যা বাড়ছে।

আমেনা আক্তার

কাস্টমার রিলেশনশিপ অফিসার।

এডুএইড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস।

তিনি নিজের বাইক নিয়ে সানন্দে চলে যান অফিসে। সকালবেলা দৌড়ে বাসে উঠার তাড়া নাই, ঘাম ফেলার প্রয়োজন নাই, তাঁর আছে দ্রুত চলা বাইক। অন্য নারী সহকর্মীরা যেখানে দেরী করে রাস্তার জ্যাম, গাড়ি পান নি এধরণের অজুহাত দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখন আমেনা খুব আয়েশ করে অফিসের চেয়ারটায় বসে চা’য়ে চুমুক দেন।

বলছিলাম নারী বাইকার আমেনা আক্তার অদ্রিতার কথা। যিনি বাইকার পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি বলেন, নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে বলেন আর পরিবহনে বলেন, সব জায়গায় নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থা আমাদের দেশে নারীদের জন্য এখনও নারীবান্ধব হয়ে উঠেনি। গণপরিবহনগুলোতে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। দু’একজন হয়তো মুখ খুলছে, আর বাকীরা মুখ গুঁজে সহ্য করে নিচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমি নারীদের পরামর্শ দিতে চাই বাইক বা স্কুটি চালানোর।

আড়াই শতাধিক নারী বাইকার ঢাকার রাস্তায় বাইক চালাচ্ছেন। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের বেশীর ভাগই পুরুষ। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এখন বাড়ছে নারী বাইকারদের সংখ্যাও। ঢাকার রাস্তায় এখন অনেক নারীকে রং-বেরংয়ের স্কুটি চালাতে দেখা যায়, এবং এখন তা স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে গেছে।

বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার নারী বাইক চালনার লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে। কারণ নারী বাইকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

নারীদের বাইক চালনায় প্রশিক্ষণ দিতে ‘যাব বহুদূর’ নিয়ে কাজ করছেন আতিকা রোমা।

প্রতিদিনের রাস্তার ঝামেলা এড়াতে রোমা স্কুটি চালানো শুরু করেন ২০০৯ সালে। তিনি বিশ্বাস করেন যাত্রাপথে নারীরা স্বাবলম্বী হলে নারী স্বাধীনতার পথে তারা এগিয়ে যাবে আরো একধাপ। ‘যাব বহুদূর’ নিয়ে রোমার অনেক স্বপ্ন। নামমাত্র ফি নিয়ে যাব বহুদূরের মাধ্যমে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। যার মধ্যে প্রায় ৮০-ভাগই চাকরিজীবী নারী। আতিকা রোমা তেজগাঁওয়ে স্কুটি চালনা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

আতিকা রোমা বাইক নিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। তিনি স্কুটি চালিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজার-টেকনাফ-কক্সবাজার হয়ে পুনরায় ঢাকা ফিরেছেন। এতে তার সময় লেগেছে তিন দিন।

কয়েকজন নারী বাইকারের সাথে কথা বলে প্রশ্ন করা হয়, কেনো তারা বাইক চালানোয় আগ্রহী হচ্ছেন এবং এক্ষেত্রে পথে-ঘাটে কতটা নারী বান্ধব পরিবেশ পাচ্ছেন তারা?

এই প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, দিনদিন রাস্তায় জ্যাম বাড়ছে এবং গণপরিবহনে চলা দূর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে, তাই বাইকের সিদ্ধান্ত। তাছাড়া সময় বাঁচাতে বাইকের বিকল্প চিন্তা করা যায় না।

নারী স্কুটি নিয়ে চলেছেন সড়ক পথে। এ দৃশ্য এখন প্রায়ই চোখে পড়ে রাজধানীতে। গণপরিবহনের ঝামেলা এড়িয়ে জ্যাম ঠেলে নারীরা নিজস্ব বাহনে চলেছেন কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

Mujib Borsho

সর্বশেষ সংবাদ

লিড

শীর্ষ সংবাদ:
আগাম ভোট দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প         কিশোরগঞ্জে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ         এল ক্ল্যাসিকোতে হারল বার্সা         পদ্মাসেতুতে বসেনি ৩৪তম স্প্যান,পাহারায় সেনাবাহিনী         ডিআরইউ’র রজত জয়ন্তীর উদ্বোধন কাল         অপরাধ করে কেউ পার পাচ্ছে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী         বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন লুইস আর্ক         ৪ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ, বাবা গ্রেফতার         বিয়ে না করা পর্যন্ত ‘সিঙ্গেল’ কিয়ারা!         গায়ে হলুদে ভাইরাল নেহা কাক্কর         শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান বাংলাদেশের         অভিনব ইচ্ছার কথা জানালেন কবীর সুমন         আল জাজিরার প্রতিবেদন : ফেব্রুয়ারি নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে মারা যেতে পারেন ৫ লক্ষাধিক মানুষ         রয়টার্সের প্রতিবেদন : করোনার আঘাতে এশিয়ায় দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ         ট্রাম্প আগাম ভোট দেবেন আজ         রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের দৃঢ় ভূমিকা চান প্রধানমন্ত্রী         ইসরাইলের সাথে শান্তি চায় আরো ৫ দেশ : ট্রাম্প         টিকা ক্রয়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণ চায় বাংলাদেশ         ‘কয়েকটি দেশে করোনা পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক হবে’